ব্রেকিং

x

অগ্নিযুগের বিপ্লবী ক্ষুদিরাম — এ যুগের প্রেরণা!

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০ | ৮:১২ অপরাহ্ণ | 237 বার

অগ্নিযুগের বিপ্লবী ক্ষুদিরাম — এ যুগের প্রেরণা!

১১ই আগষ্ট ১৯০৮ সালের এই দিনে অগ্নিযুগের প্রথম শহিদ ক্ষুদিরাম বসুকে বৃটিশ শাসকগোষ্টী ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মেরেছিল। যা তৎকালীন ভারতবর্ষ তথা গোটা বিশ্বকে অবাক করেছিল সদ্য কিশো্রের এই মহান আত্মত্যাগ। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর ৮ মাস ৮ দিন। তাঁর নির্ভীক দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ বাংলার যুবসমাজকে বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিল। যা আজও মানুষকে আন্দোলিত করে। মহান এই বিপ্লবী ১৮৮৯ সালের ডিসেম্বর মাসে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত মেদিনীপুর জেলা শহরের কাছাকাছি কেশপুর থানার অন্তর্গত মোহবনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল শ্রী ত্রৈলক্যনাথ বসু এবং মা লক্ষীপ্রিয় দেবী। তিন কন্যার পর তিনি তার মায়ের চতুর্থ সন্তান। তার দুই ভ্রাতা আগেই মৃত্যুবরণ করেন। অপর পুত্রের মৃত্যুর আশঙ্কায় তার মাতা -পিতা তখনকার সমাজের নিয়ম অনুযায়ী তাকে তার বড় বোনের কাছে তিন মুঠি খুদের (শস্যের খুদ) বিনিময়ে বিক্রি করে দেন । খুদের বিনিময়ে ক্রয়কৃত শিশুটির নাম পরবর্তীকালে ক্ষুদিরাম রাখা হয়। পরবর্তিতে তার বড় বোনের কাছেই বড় হন। তবে খুব অল্প বয়সেই মা-বাবাকে হারান ক্ষুদিরাম। জানা যায় তিনি শৈশব কাল থেকেই একটু ডানপিটে স্বভাবের ছিলেন।তাঁর মধ্যে ছিল অত্যন্ত সৎসাহস। আর তাঁর ছিলো অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র অনুভূতি। আর সেই অনুভূতিই তাকে অল্প বয়সে করে তুলে একজন পরিণত বিপ্লবী চেতনায়।দুরন্ত প্রকৃতির সাথে বিপ্লবী চেতনার ছোঁয়া পেয়ে ক্ষুদিরাম যেন এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠলেন। বাংলায় গুপ্ত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হেমচন্দ্র কানুনগোর সাথে ক্ষুদিরামের প্রথম সাক্ষাতের ঘটনায় তার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায়।

প্রবাদ আছে, ক্ষুদিরামের বয়স যখন তের-চৌদ্দ হবে। একদিন বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুনগো মেদিনীপুর রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। ক্ষুদিরাম তাকে দেখে দৌড়ে এসে তার বাইক আটকালেন এবং বললেন- ” আামকে একটা রিভলবার দিতে হবে। ” হেমচন্দ্র অজানা –অচেনা একটি বালকের এররকম আবদারে অনেকটাই বিরক্ত হলেন।জিজ্ঞেস করলেন, “তুই রিভলবার দিয়ে কি করবে?” ক্ষুদিরাম জবাব দিলেন, “ সাহেব মারবো , এরপর তিনি ইংরেজ অত্যাচারের কাহিনী বলে কেন সাহেব মারবেন সেসব যুক্তি দিতে শুরু করলেন। সেদিন ধমক দিয়ে পাঠিয়ে দিলেও ছোট্ট বালকটির প্রেরণা তাকে অভিভূত করেছিল।

ক্ষুদিরামের শিক্ষাজীবন কাটে হ্যামিলটন এবং মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে। সেই সময় থেকেই গুপ্ত সংগঠনের সাথে যুক্ত হন। বৃটিশদের নানা অত্যাচার নিপীড়নের কথা শুনে , দেশমাতৃকার সেবায় নিয়োজিত করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। ক্ষুদিরাম প্রথম আলোচিত হন ব্রিটিশ বিরোধী সোনার বাংলা’ লিফলেট বিলি করতে গিয়ে। ১৯০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মেদিনীপুরে এক কৃষি-শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ক্ষুদিরাম সেই প্রদর্শনীর প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে সবার কাছে এই লিফলেট বিলি করতে শুরু করেন। এ সময় একজন পুলিশ কনস্টেবলের হাতে ধরাও পড়ে যান তিনি। কিন্তু ক্ষুদিরাম কি আর সহজে ধরা দেন? শোনা যায়, বক্সিং এর কেরামতিতে সেদিন কনস্টেবলের নাক ভেঙে দিয়েছিলেন , তবুও নিজেকে ছাড়াতে পারেননি। আরেক বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ তখন কালেক্টরিতে এক ডেপুটির অফিসে কাজ করতেন। তিনি সেই প্রদর্শনীর সহকারি সম্পাদকও ছিলেন। ক্ষুদিরাম ধরা পড়লে পুলিশের কাছ থেকে তিনি তাকে কৌশলে ছাড়িয়ে নেন। এরপর যতক্ষণে পুলিশরা কৌশলটি ধরতে পারেন, ততক্ষণে ক্ষুদিরাম হাওয়া। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সত্যেন চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। আর ক্ষুদিরামের নামে ঠুকে দেওয়া হয় রাজদ্রোহী মামলা’। সম্ভবত বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে এটিই সর্বপ্রথম রাজদ্রোহী মামলা ছিল।

রাজনৈতিকভাবে যখন স্বদেশী আন্দোলনও বঙ্গভঙ্গ রদে ব্যর্থ হলো, তখন বিপ্লবীরা সিদ্ধান্ত নিল আক্রমণে যাবার। আক্রমণ বলতে ইংরেজ কর্তাব্যক্তিদের খুন ও বিপ্লবের অর্থ সংগ্রহের জন্য সরকারি কোষাগার বা কোনো ইংরেজের বাড়িতে ডাকাতি ইত্যাদিকে বোঝানো হতো। এই অ্যাকশনের’ উদ্দেশ্য ছিল এসব হামলার খবর দেশব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে, আলোচনা-সমালোচনা চলবে। দেশের মানুষের কাছে বিপ্লবীদের বার্তা পৌঁছে যাবে। আর যেহেতু দেশে ইংরেজ-বিদ্বেষী তখন প্রকট, তাই মানুষ সমর্থনও দেবে। এ পরিকল্পনার অনুযায়ী দেশব্যপী বিপ্লবীদের সশস্ত্র হামলা শুরু হয়। বিভিন্ন চোরাগোপ্তা হামলা ও পুলিশের সাথে সংঘর্ষ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠে। তবে এ সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিকল্পনার মধ্যে ছিল গভর্নর ফুলার ও ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড হত্যাচেষ্টা। ১৯০৮ সালের দিকে এই ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড হত্যার দায়িত্ব ক্ষুদিরামের ওপর ন্যস্ত করা হয়। কিংসফোর্ড ছিলেন তখনকার ফৌজদারী আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট। মামলায় বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে কঠিনতর সাজা দেওয়ায় তার উপর ক্ষিপ্ত ছিলেন তারা।

ক্ষুদিরামের আগেও কিংসফোর্ডকে হত্যা করার অন্য একটি চেষ্টা করা হয়েছিল। একটি পুস্তকবোমা তৈরি করে তার কাছে পাঠানো হয়, এটি এমনভাবে সেট করা ছিল যে, বইটি খুললেই বোমাটি বিস্ফোরিত হয়ে যাবে। কিন্তু কিংসফোর্ডের কাছে বইটি পাঠানো হলে তিনি এটি খোলেননি। তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো কেউ তার কাছ থেকে ধার নেয়া বই ফেরত দিয়েছে। তাই তিনি ওভাবেই রেখে দিয়েছিলেন এটি। এরপর দ্বিতীয়বার এ দায়িত্ব পড়ে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকীর কাঁধে।
মি. কিংসফোর্ড তখন মোজাফফরপুরের জজ। এপ্রিল মাসের শেষের দিকে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্লকে শিখিয়ে-পড়িয়ে পাঠানো হয় মোজাফফরপুর। প্রফুল্ল ও ক্ষুদিরাম আগে থেকে একে অপরকে চিনতেন না। রেল স্টেশনেই তাদের প্রথম দেখা। আগে কয়েকটি মিশন ব্যর্থ হওয়ায় এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই দল থেকে সেরা এ দুজনকে বাছাই করা হয়েছিল। এ দায়িত্ব পেয়ে দুজনেই যেন কৃতার্থ হয়ে গিয়েছিলেন। পুলিশের চোখকে ফাকি দিয়ে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল মোজাফফরপুরে পৌছালেন। এরপর কিংসফোর্ডের গতিবিধির উপরে নজর রাখতে শুরু করলেন। টানা সাত দিন নিয়মিত লক্ষ্য করার পর ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল একটি মোক্ষম সময় বের করে নিলেন। কাংখিত দিন ৩০ শে এপ্রিল ১৯০৮, সন্ধ্যা ৮টা নাগাদ তারা দেখতে পেলেন সাদা ঘোড়ার গাড়িটি এগিয়ে আসছে বাংলোর দিকে। পরিকল্পনা মতো বোমা ছুঁড়ে মারলেন তারা। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে চুরমার হয়ে গেল গাড়িটি। ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল তাদের মিশন সফল ভেবে চলে আসলেন সেখান থেকে। কিন্তু তারা জানতেন না, সেই সাদা গাড়িটিতে সেদিন কিংসফোর্ড ছিলেন না। বাস্তবে সেদিন মিসেস এবং মিস কেনেডি নাম্নী নামে দুই ইংরেজ নারী নিহত হয়েছিলেন।

ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল ত্যাগ ও একনিষ্ঠতার সাথে কাজ করলে ও কিছু ভুল তারা করে বসেছিলেন। বিপ্লবীদের তরফ থেকে তাদের উপর নির্দেশ ছিল যে, তারা যেন মিশনের সময় অন্য কোন প্রদেশের লোকের অনুকরণে পোষাক পরিধান করে। এরপর মিশন শেষ করে যেন বাঙ্গালী পোষাক বেশ ধারণ করে। বাস্তবে তারা তা মানেন নি।ভুল ছিল আরো একটি। রিভলবার জিনিসটির প্রতি ক্ষুদিরামের দুর্বলতা ছিল আগে থেকেই। অপব্যবহারের ভয়ে এর আগে এটি তার হাতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু এ মিশনে তার এবং প্রফুল্ল দুজনের কাছেই একটি করে রিভলভার দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ক্ষুদিরাম লুকিয়ে নিজে আরেকটি রিভলবার নিয়েছিলেন অস্ত্রাগার থেকে। বোমা বিস্ফোরণ হওয়ার পর রিভলবার ফেলে দেওয়ার জন্য তাদেরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রিভলবারের প্রতি আকর্ষণ থাকার কারণে তিনি তা করেননি। পরবর্তীতে যখন ক্ষুদিরাম ধরা পরেন, দেখা যায় যখন তিনি খাবার খাচ্ছেন আার পাতলা জামার মধ্যে দুইটি রিভলবার ঝুলছে।
এছাড়াও জানা যায়, যদি তারা ধরা পরেন, তাহলে উকিল ব্যতীত তারা যেন অন্য কারো কাছে মুখ না খুলে। কিন্তু ক্ষুদিরাম ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন । তিনি এবং তার সহেযোগী প্রফুল্ল চাকী দুজন মিলে সব পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে গুপ্তসংঘের কথা সুকৌশলে এরিয়ে যান। অন্যদিকে প্রেফতার এড়ানোর জন্য প্রফু্ল্ল চাকী আত্মহত্যা করে ফেলেন। যা সত্যি হৃদয় বিদারক। তবে একটা বিষয় খুব অবাক করার মত তা হলো ক্ষুদিরামে বিচারের সময় তৎকালীন ঐ এলাকার কোন অ্যাডভোকেট দাড়াতে রাজি হননি। শেষে পূর্ববঙ্গের রংপুর থেকে যাওয়া কয়েকজন আইনজীবি লড়েছিলেন ক্ষুদিরামের পক্ষে। উকিলদের অনেকটা জোরাজুরিতে আগে ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দি বদলে নতুন করে জবানবন্দি দেন। কিন্তু এতে কোন বিশেষ লাভ হয় নি। ব্রিাটশ সরকার বিপ্লবের প্রশ্নে ছিলেন আপোষহীন। ফাঁসির সাজা শোনানো হয় ক্ষুদরিামকে । তার শেষ ইচ্ছা কি জানতে চাইলে বলেন, ” আমি বোমা বানাতে পারি, অনুমতি দিলে, তা সকলকে শিখিয়ে যেতে পারি “ ব্রিটিশ কর্তারা তা গ্রহন করেননি বা করবেনই বা কেন। তবে তার দ্বিতীয় ইচ্ছার কথা জানতে চাইলে, তিনি তার বোনেরসাথে সাক্ষাৎ করতে চান, বলে জানালেন। কিন্তু তার সেই ইচ্ছা বোন জামাই পুরণ করতে দেননি। তবে তার এক মেদিনীপুরের এক বোন ( নাম জানা য়ায়নি) তাকে ভাইয়ের স্নেহে আশ্রয় দিয়েছিলেন, অনেকটা বিপদ মাথায় নিয়ে সাক্ষাৎ করেছিলেন। অবশেষে নক্ষত্রের পতন । ১৯০৮ সালের ১১ই আগষ্ট এই মহান বিপ্লবীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। প্রতক্ষদর্শীর কাছ থেকে জানা যায় ,তিনি ফাঁসির দড়িকে হাসিমুখে বরণ করেছিলেন। বিখ্যাত লোককবি পিতাম্বর দাস রচিত কয়েকটিপঙক্তি আজও মানুষের মুখে মুখে ফিরে, ” একবার বিদায় দেমা ঘুরে আসি…………………………………………………………….. । “ এই গানের তাৎপর্য আজ ও দেশ্রপ্রেমিকদের প্রাণের ভাষা। ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়েছে এক শতাব্দীর উপরে কিন্তু মানুষ আজ ক্ষুদিরামকে স্মরণ করে দেশপ্রেমের জ্বলন্ত অগ্নেয়গিরি হিসাবে। তাইতো কবি অত্যাচারী শাসকদের উদ্দেশ্যে উচ্চারণ করলেন –

” পরোয়া করি না, বাঁচি বা না বাচিঁ যুগের হুজুগ কেটে গেলে।
মাথার উপর জ্বলিছেন , রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থণা করো – যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মানুষের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ !” ( আমার কৈফিয়ৎ , কাজী নজরুল)
অমর বিপ্লবী বেঁচে থাকবেন বাঙ্গালি হৃদয়ের মানসপটে । তার এই আত্মত্যাগ আজও অনুপ্রেরণা যোগায় হাজারো বিপ্লবী দেশপ্রেমিকদের । জয় হোক বাঙ্গালী চেতনা ও মূল্যবোধের।

তথ্যসূত্র:
বাংলাপেডিয়া, উইকিপেডিয়া।
বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান, দ্বিতীয় সংস্করণ_ ১৯৯৭; ঢাকা,।
আমি সুভাষ বলছি (অখণ্ড) শৈলেশ দে। ১৩৯৮।

Development by: webnewsdesign.com