ব্রেকিং

x

অর্পিতার দেশপ্রেম/মাধুরী দেবনাথ

মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯ | ৯:৫০ পূর্বাহ্ণ | 531 বার

অর্পিতার দেশপ্রেম/মাধুরী দেবনাথ

আজ অর্পিতার ২৬তম জন্মবার্ষিকী। আত্মীয়রা আসতে শুরু করছে। ২দিন হইছে অর্পিতা গুগলে চাকরীর সুযোগ পেয়েছে। ওর সামনে রাখা হয়ছে একটা বিশাল বড় কেক। চারদিকে মোমের আলোয় ঝলমল করছে। স্মৃতি দত্ত আত্মীয়দের দেখাশোনা করছেন। কিছুদিন হল উনি শিশুউন্নয়ন সংস্থা থেকে অবসর নিয়েছেন। অর্পিতার একমাত্র বন্ধু তনিমা আসছে ও বারবার অর্পিতাকে ডাকছে কেক কাটার জন্য।

অর্পিতা আজ একটা সবুজ রঙের গাউন পরছে।খুব উজ্জ্বল দেখাচ্ছে ওকে। হঠাৎ অর্পিতার মনে পড়লো আজ থেকে ২৪বছর আগের কথা। কাকরাইলের মোড়ে দাঁড়িয়ে ফুল বিক্রি করত সে। অর্পিতা খুব বনেদী পরিবারের সন্তান ছিল। বাবা কলেজ শিক্ষক আর মা পানি উন্নয়ন বোর্ডে চাকরী করতেন। অর্পিতার জন্মের ৪বছর পর ওর বাবা মা ২জন সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যান। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় অর্পিতা। অর্পিতাকে দেখার মত কেউ ছিল না। ওর বাবার দূর সম্পর্কের এক বোন অর্পিতাকে নিয়ে আসেন নিজের কাছে। এই ভাবে চলছিল অর্পিতার জীবন। কিন্তু অর্পিতার ফুফাতো বোন তাকে একদম সহ্য করতে পারতো না। হঠাৎ একদিন ওর ফুফু মারা যান। অর্পিতার জীবনে নেমে আসে অমানিশা। ওর ফুফা আর বোন মিলে ওকে বিক্রি করে দিল ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে এক পাচার কারীর কাছে। অর্পিতার আসল নাম ছিল মিলি রায়হান। ছোট অর্পিতাকে পাচারকারীদের কথা মত কাজ করতে হত। ওদের কথা না শুনলে চলত অমানুষিক নির্যাতন। এভাবেই চলছিল অর্পিতার দূর্বিসহ দিন।
একদিন দুপুরবেলায় ঝিকরগাছা একটা বাসস্টপের পাশে দাঁড়িয়ে ফুল বিক্রি করছিল অর্পিতা। এই সময় তার পাশ দিয়ে একটা গাড়ি করে যাচ্ছিলেন অপু ও স্মৃতি দম্পতি। স্মৃতি দত্ত জানালার কাচ দিয়ে বাইরে তাকাইছিলেন হঠাৎ উনার চোখ আটকে গেল একটা ছোট মেয়ে রোদে দাঁড়িয়ে ফুল বিক্রি করছে। শুকনো ছিপছাপ শরীর মুখটা ভীষণ মায়াবী। রোদে মুখটা একদম লাল হয়ে গেছে। স্মৃতি দত্তের মায়া পড়ে গেল মেয়েটির উপর। ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললেন। নেমে পড়লেন স্মৃতি। উনার পিছু পিছু অপু দত্ত ও নেমে পড়লেন। এই দম্পতির বিয়ের ১৪বছর হয়ে গেছে এখনও কোনও সন্তান হয় নি। স্মৃতি দত্ত একটা সন্তানের জন্য সবসময় ই ছটফট করেন।
আজ অর্পিতাকে দেখে উনার মাতৃত্ব আবার জেগে উঠল। ধীরে ধীরে অর্পিতার কাছে গেলেন তিনি। মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,বাবু, কোথায় থাক তুমি?
জানি না।
তোমার নাম কি?
মিলি।
বাবা মা কই থাকে তোমার?
মইরা গেছে,আমি ভিক্ষা করি।ওরা আমায় খুব মারে। কাইলকা রাতেও আমারে মারছে খাওন ও দেয় নাই। ও ম্যাডাম,আমার এই ফুল গুলান নিয়া আমায় ইট্টু ট্যাহা দেও না খাওন কিইনা খামু।
কারা মারে তোমায়?
কিছু না বলে মৌন হয়ে রইল অর্পিতা। কি যেন চিন্তা করছে।
আচ্ছা মিলি, আমি যদি তোমায় নিয়ে যেতে চাই একেবারে যাবে আমার সাথে? তোমায় বিরিয়ানি খাওয়াবো,আইসক্রিম খাওয়াবো,চকলেট দিব।
অর্পিতার মনে পড়ে কয়দিন আগে একটা অর্ধেক খাওয়া বিরিয়ানির প্যাকেট কুড়িয়ে পেয়েছিল কি যে মজা লাগছিল সেই দিন বিরিয়ানিটা খেতে।
এই ম্যাডাম তাকে পুরো বিরিয়ানির প্যাকেট খাওয়াবে শুনেই খুশিতে মন ভরে উঠলও অর্পিতার। পরক্ষনেই তাকে খুঁজে না পেলে ওরা মারবে এই কথা ভেবেই মনটা একদম খারাপ হয়ে গেল।
কি হল? বাবু,তোমার মন খারাপ হয়ে গেল কেন? যাবে আমার সাথে?
না। ওরা খুব মারবে।
আচ্ছা তুমি আমায় ওদের কাছে নিয়ে চল।
তোমায় আমি আইসক্রিম কিনে দিচ্ছি।

২দিন আগে ওর সাথের রাইসা কাগজ কুড়াতে গিয়ে ৫টাকার একটা নোট পেয়েছিল।ওটা দিয়ে একটা আইসক্রিম কিনে খেয়েছিল ২জন মিলে ভাগ করে। খুব মজা লাগছিল খেতে।
আচ্ছা আহেন আফনেরে লইয়া যাই।
অর্পিতা স্মৃতি ও অপু দত্তকে নিয়ে একটা ভাঙাচোরা ঘরে ঢুকল। সামনে একটা গুন্ডামতন লোক বসে আছে।
এই বিচ্ছু, কারে ধইরা নিয়া আইছস?
না,সাহেব উনারা আমারে বললেন তাগো সাথে চইলা যাইতে আমারে বিরিয়ানি কিইন্না দিবেন।
আমি যাই নাই সাহেব উনাদের লইয়া এইখানে চইলা আইছি।
স্মৃতি দেবী গুন্ডামতন লোকটার সাথে কথা বলছেন। লোকটির নাম মোতালেব। লোকটা দেখতে যেমন কদাকার ঠিক মেজাজটা ও বদ।
দেহেন ভালোয় ভালোয় চইলা যান,নাইলে খবর আছে কইয়া দিলাম।
স্মৃতি দেবী অনেক অনুনয়-বিননয় করলেন অর্পিতাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য শেষে লোকটি ৫লাখ টাকার বিনিময়ে অর্পিতাকে দিতে রাজি হল।
এই মিলি যা আজ থেকে উনারা তোর সাহেব আর মেমসাহেব উনারা যা বলবেন শুনবি তাই করবি। টাকা পেয়ে খুশীতে গদগদ হয়ে বলল মোতালেব।
স্মৃতি আর অপু দম্পতি মিলিকে নিয়ে ফিরে আসলেন গাড়িতে। আজ মিলিকে খুব উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। পেট পুরে বিরিয়ানি খাবে সে।
মেমসাহেব আমরা কই যামু?উৎসুক চোখে জানতে চাইল মিলি।
কেন? আমার কাছে স্মৃতি জবাব দিলেন।
আর শুন আজ থেকে আমি তোর মা আর আমার পাশে যাকে দেখছিস উনি তোর বাবা।
মেমসাহেব ডাকবি না মা ডাকবি কেমন!
মাথা নাড়লো মিলি। সবকিছু তার চোখে স্বপ্ন লাগছে।
গাড়ি চলছে। মিলি মধ্যখানে বসে আছে। আর মনে মনে অদ্ভুত স্বপ্ন রচনা করে চলছে। একটু তো খারাপ লাগছেই তিনটা বন্ধুকে রেখে যাচ্ছে সে।আর কি দেখা হবে ওদের সাথে?
মাঝরাস্তায় একটা চায়নিজ রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি থামাতে বললেন স্মৃতি দত্ত।
মিলিকে নিয়ে নেমে পড়লেন। অপু সাহেব গাড়িতে বসে রইলেন। অনেক খাবারের অর্ডার দিলেন। টেবিলের উপর এত খাবার দেখে অবাক হয়ে গেল মিলি। জীবনের প্রথম এত খাবার দেখছে। বিয়ে বাড়ির খাবারের মত।
মা-বাবা মারা যাবার পর প্রথম এই কেউ তাকে এইভাবে হাত ধরে খেতে নিয়ে আসল।
স্মৃতি দত্ত নিজ হাতে খাইয়ে দিচ্ছেন মিলিকে।আজ পেট পুরে খেল মিলি। প্রতিদিন মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার খায় সে আজ ই প্রথম পূর্ন খাবার খেল সে। এখন তার ঘুম পাচ্ছে।
স্মৃতিদত্ত খাবারের বিল মিটিয়ে মিলিকে নিয়ে গাড়িতে এসে বসলেন। গাড়ি চলছে। মিলির চোখ বুজে আসছে। আমি তোমার পাশটাই একটু ঘুমাই মেমসাহেব?
ঘুমাও। তোকে না বলছি আমায় মা ডাকবি।মেমসাহেব না।
হুম। মা ডাকব।
স্মৃতিদত্ত পরম যত্নে মিলির মাথাটা উনার কোলের উপর রাখলেন। উনার বিয়ের ১৪বছর পর আজ মিলিকে নিজের মেয়ে করে নিয়ে যাচ্ছেন।
সকাল ১০টা বাজে। আজ মিলিরা নিউইয়র্ক যাচ্ছে ১১টার ফ্লাইটে। মিলির ভাল লাগছে কিন্তু খুশি লাগছে না। এই দেশটাকে সে দেখতে পারবে না,কাগজ কুড়াতে পারবে না,সবুজ মাঠ দেখতে পারবে না। বন্ধুদের দেখতে পারবে না।
মিলিরা নিউইয়র্ক পৌঁছালও পরদিন রাত ৯টায়।
স্মৃতি মিলির নাম পরিবর্তন করে রাখলেন অর্পিতা দত্ত। অর্পিতাকে একটি স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। অর্পিতার কোনও অপূর্ণতা রাখেন নি তিনি। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করছেন নিজের সন্তানের মতই।
হঠাৎ তনিমার ডাকে সম্বিত ফিরে পায় অর্পিতা।
কি রে আন্টি তোকে কখন থেকে ডাকছে আর তুই কি চিন্তা করে চলছিস?
না কিছু না। মা কোথায় রে?
এই তো তোকে ডেকে কি যেন আনতে গেলেন।
স্মৃতি দত্ত আসছেন হাতে কি একটা নিয়ে। কি রে কেকটা কেটে ফেল
হাঁ মা,এইতো আস তুমি।
অর্পিতা কেক কাটল। স্মৃতি ও অপু দত্তের অনেক বন্ধুরা আসছেন। আজ তাদের একমাত্র মেয়ের জন্মদিন। স্মৃতি দত্ত অর্পিতাকে একজোড়া স্বর্ণের বালা উপহার দিলেন। বাঙালিয়ানা উপহার পেয়ে খুব খুশি অর্পিতা। অর্পিতার আজ আরো খুশি লাগছে কারন মা স্বপ্ন ছিল গুগলে চাকরী। মা’ র স্বপ্নটা অর্পিতা পূরণ করতে পেরেছে। ২জন সাংবাদিক আসছেন অর্পিতার বাবার বন্ধু। অর্পিতার মায়ের বান্ধবী লেখিকা ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় ও এসেছেন অর্পিতার জন্মদিনে। অর্পিতা ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের লিখা খুব পছন্দ করে। উনি উনার একটা বই অটোগ্রাফ সহ অর্পিতাকে দিলেন। বেশ ঘটা করেই অনুষ্ঠান হল। এবার সাংবাদিকদের কিছু প্রশ্ন আর ছবি উঠানোর পালা। অর্পিতাকে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন,আপনি তো এখন একজন সফল মানুষ আপনার পরবর্তী পরিকল্পনা কি?

অর্পিতা বলল সে বাংলাদেশে ফিরতে চায়,সবুজ মাঠ দেখতে চায়,কুলফি আইসক্রিম খেতে চায়,নদীতে সাঁতরাতে চায়,বৃষ্টিতে ভিজতে চায়,পথশিশুদের সাথে ঘুরতে চায় ওদের পেটপুরে খাওয়াতে চায়। সে বিদেশের উন্নয়ন নয় দেশের উন্নয়ন করে দেশের মাটিতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে চায়। দেশপ্রেম একটি মানবিক অনুভূতি ও আবেগকেন্দ্রিক চেতনা। যোজন যোজন দূরে থাকলেও এই ভালোবাসার শেষ হয় না।
লেখক: বি,এস,এস(অনার্স). এম,এস,এস(অর্থনীতি), এমসি কলেজ,সিলেট।

Development by: webnewsdesign.com