ব্রেকিং

x

অশ্রুসিক্ত সাদা গোলাপ # মাধুরী দেবনাথ

বুধবার, ১০ জুলাই ২০১৯ | ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ | 600 বার

অশ্রুসিক্ত সাদা গোলাপ # মাধুরী দেবনাথ

দুপুরের কড়া রোদে দাঁড়িয়ে ফুল বিক্রি করছিল ৮থেকে ৯ বছরের একটা ছেলে।নিউইয়র্ক শহরের রাস্তার পাশে ফুল বিক্রি করাটা অবৈধ।

দুজন ট্রাফিক পুলিশ ছেলেটাকে সরাতে চাচ্ছে বারবার কিন্তু ছেলেটা অনড়।একহাতে ফুল আর অন্যহাতে চোখ মুছছে অনবরত।ধাক্কাধাক্কিতে গাম দরদর করে ঝরছে ছেলেটির গায়ে থেকে।পুলিশগুলো কিছুতেই পেরে উঠছে না ছোট্ট এই ছেলেটির সাথে।পাশ দিয়েই যাচ্ছিলেন টমাস হাডসন।নিউইয়র্ক সেনাবাহিনী র সাবেক প্রধান।তিনি শিকার খুব পছন্দ করেন।সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন শিকার খুঁজতে মধ্যাহ্নের দুপুরে!
ছেলেটিকে দেখে মায়া পড়ে গেল তার।টমাস পুলিশকে কি যেন ইশারা করলেন সাথে সাথে পুলিশ ছেড়ে দিল ছেলেটিকে।ছেলেটি ফুলগুলো চেপে ধরে কাঁদতে লাগল,ভয় কাটে নি ওর।টমাস এগিয়ে এলেন ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,’আমি আছি তো কিছু হবে না তোমার’।ছেলেটিকে রাস্তার পাশে বসিয়ে পাশের একটা দোকান থেকে একবোতল পানি নিয়ে আসলেন।গভীর মমতায় ছেলেটির মুখ মুছিয়ে দিলেন আর কিছু পানি খেতে দিলেন ওকে।এই প্রখর রোদে ছেলেটির ফর্সা মুখ লালবর্ণের হয়ে ওঠেছে।পানির ছিটা পেয়ে ওর শরীরে যেন স্বস্তি ফিরে এলো।টমাস ভেজা হাতে ছেলেটার গাল ছুঁয়ে দিয়ে বললেন,’তোমার নাম কি?
আলভি!কাঁপা কাঁপা গলায় বলল ছেলেটি।
‘থাকো কোথায় তুমি?’
ব্রুকফিল্ড!
শহর থেকে অদূরেই একটা গ্রাম ‘ব্রুকফিল্ড’।
টমাস যেন কি একটা ভাবনাতে ডুবে গেলেন কিছুক্ষণের জন্য।

ব্রুকফিল্ড গ্রামটির সাথে তার রয়েছে আত্মার একটা টান।
‘আলভি তো মেয়েদের নাম!তোমার নাম কেন ওটা?’
‘মা বলেছে আমার বাবা মেয়ে খুব ভালোবাসতো তাই জন্মের পর আমার মেয়েদের নামই রেখে দিল।’
‘কি পাকা পাকা কথা রে বাব্বা এতটুকুন ছেলের মুখে।’বলে আলতো করে আদর করে গালটা টেপে দিলেন টমাস।
হঠাৎ টমাসের চোখ পড়লো আলভির হাতের ফুলের দিকে।
‘তুমি কি এই ফুলের নাম জানো?’
না,তবে আমার মা জানেন।আমাদের বাগানে এই ফুল রোজ ফুটে।আর আমি তা ওইখানে বিক্রি করি।’
‘তোমার মা কোথায়?’
মা তো অসুস্থ!
বাবা?
ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল আলভি।
‘তা তো জানি না।তবে মা কে বললে বলে একদিন আমায় নিতে আসবে।’
টমাসের ভিতরটা কেমন জানি হু হু করে উঠলো।
‘চলো তোমাদের বাড়ি যাব।’
‘তা তো পারবো না।ফুল বিক্রি না হলে খাবো কি?মাকে ওষুধ দিব কোথা থেকে?’
‘তোমার সবগুলো ফুলের দাম কত’?

১ডলার।অনেক চিন্তা করে বলল আলভি।
‘আমি যদি তোমায় ১০ডলার দেই দেবে আমায় সবগুলো ফুল?’
আলভি খুশিতে টমাসকে জড়িয়ে ধরলো।
‘কাল থেকে তুমি এখানেই ফুল বিক্রি করবে কেউ কিছু বলবে না।’এবার বাড়ি চল তোমার!
দুজন মিলে রওয়ানা দিলো।কিছুক্ষণ ঘোড়ার গাড়িতে চেপে ওরা পৌঁছুলো আলভির বাড়ির সামনে।
মান্ধাতার আমলের বাড়ী।বাড়ীর সামনে একটা ফুলের বাগান।বাগানের একপাশে কাঠগোলাপ, আরেক পাশে হৃদয়কাড়ানো সবুজ বৃতির মাঝে সাদাবর্ণের বিরল প্রজাতির একধরণের গোলাপ! দেখলে কেমন জানি পবিত্রতায় মন ভরে যায়!
সচরাচর এই ফুল দেখতে পাওয়া যায় না।টমাস আর আলভি পুরো বাগানটা ঘুরে ঘুরে দেখলো ছোট ছোট অনেক ধরণের ফুলের গাছ আছে ওখানে।এই বিরল গোলাপটি কোন মহিলা সড়ক দূঘর্টনায় মর্মান্তিক মৃত্যু হলে তার কফিনের ওপর দেওয়া হয়!
টমাসের মনে পড়লো আজ থেকে ১০বছর আগের কথা।শিকারের উদ্দেশ্য নিয়ে এই গ্রামে এসেছিলেন তিনি।প্রচণ্ড রোদে আর পানি পিপাসায় বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন তিনি।আশে পাশে কোনও বাড়ীও দেখা যাচ্ছিল না।
হঠাৎ একটা ভাঙাচোরা বাড়ী চোখে পড়ল।টমাস সেই বাড়িটিতে ঢুকলেন।বাড়ীর সামনে অনেক মানুষের ভীড়। সদ্য কে যেন মারা গেছে।
টমাস ভীড় ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন।একজন সুন্দরী মহিলা তার মায়ের মৃতদেহ নিয়ে আহাজারি করছেন।মহিলার মা কিছুক্ষণ আগে রোড এক্সিডেন্ট করে মারা গেছেন।
মানুষ জন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে কিন্তু কেউ মেয়েটিকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে না।
টমাস এগিয়ে এলেন।কি করবেন বোঝতে পারছিলেন না।
সাতপাঁচ না ভেবে মহিলার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘চলুন উনার মৃতদেহের সৎকারের ব্যবস্থা করি’।
আলভিয়া টমাসকে কখনো দেখেন নি।এত লোকের মধ্যে কেউ এগিয়ে আসে নি ওই লোকটা ছাড়া।
আলভিয়া টমাসকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।মা ছাড়া তার কেউ ছিল না, এখন আর কেউই রইল না।

টমাস আর আলভিয়া মিলে মৃতদেহের সৎকার করে কফিনের ওপর সেই বিরল সাদা গোলাপ রেখে বাড়ীতে আসলেন।তখন সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই। টমাস থাকবেন না চলে যাবেন বোঝতে পারছিলেন না অসহায় একটা মেয়েকে এভাবে একাকী ফেলে যেতে তার মন সায় দিচ্ছিল না।
আলভিয়ার অনুরোধে থেকেই গেলেন।উনার একটা মায়া জন্মে গিয়েছিল আলভিয়ার প্রতি।
সিদ্ধান্ত নিলেন এভাবে ওকে একা রেখে যাওয়া ঠিক হবে না।আলভিয়াকে বিয়ে করে নিয়ে যাবেন নিউইয়র্ক।
অদূরে একটা পুরনো চার্চে ওদের বিয়ে হলো।ভালোই কাটছিল দিন।হঠাৎ করেই ২য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো।টমাস ছিলেন সেখানকার সেনাবাহিনীর প্রধান তাই তাকে যুদ্ধে যেতে ডেকে পাঠানো হলো।কিন্তু আলভিয়াকে নিয়ে সেখানে যাওয়াটা ঠিক হবে না।তাই আলভিয়াকে রেখে যাওয়ার মনস্থির করলেন টমাস।আলভিয়া তখন ২মাসের সন্তান-সম্ভবা।
স্ত্রী কে রেখে টমাস যুদ্ধে যোগ দিলেন।যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে শুনতে পেলেন ব্রুকফিল্ডে একটা দাবানল উঠেছিল এতে সব বাড়ীঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়।খুব কষ্টে স্ত্রীর, অনাগত সন্তানের স্মৃতি নিয়ে ১০বছর কাটিয়ে দিলেন একা একা।
আজ আলভিকে দেখার পর কেন জানি তার পিতৃহৃদয় আবার সন্তানের জন্য হাহাকার করে উঠলো।
আলভি ডাক দিলো, মা!
দেখো কে আসছে।
আলভিয়া জীর্ণ শরীর নিয়ে বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না।
খুব কষ্টে মুখ বাড়িয়ে টমাসের মুখটা দেখেই চোখটা বন্ধ করে দিলেন।
স্বপ্ন না তো…এ কি দেখছি?
আলভি দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরলো।
মা!মা,তোমার কি হয়েছে এমন করছো কেন?
‘ও মা,তুমি কি উনারে চেনো?’
আলভিয়া নির্বাক হয়ে চেয়ে আছেন টমাসের দিকে কিছু বলতে পারছেন না।
টমাসের ও চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে সমুদ্রের ধারা…..

লেখক: বি এস এস (সম্মান), এম এস এস(অর্থনীতি)
সিলেট এমসি কলেজ।

Development by: webnewsdesign.com