ব্রেকিং

x

আইনজীবি তালিকা ভুক্তির দীর্ঘ সূত্রীতা – শিক্ষানবীশরা মহা সংকটে!

শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২০ | ৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ | 299 বার

আইনজীবি তালিকা ভুক্তির দীর্ঘ সূত্রীতা – শিক্ষানবীশরা মহা সংকটে!
ফাইল ছবি

আইনজীবি তালিকা ভুক্তির কাজটি একমাত্র বাংলাদেশ বারকাউন্সিল নামক প্রতিষ্ঠানটির।ইহা একটি সায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান যা ১৯৭২ সালে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ৪৬নং আদেশ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে নিয়মিত অ্যাডভোকেট হিসাবে তালিকাভুক্তির কাজটি করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথমদিকে তালিকভুক্তির কাজটি শুধুমাত্র ভাইবার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সময়ের প্রয়োজনে পরবর্তীতে লিখিত সংযোজন হয়।

সর্বশেষ ২০১২ সাল থেকে এমসিকিউ যুক্ত করা হয়।পরীক্ষা পদ্ধতি তিন ধাপে উন্নীত হয়। এতে করে আইনজীবি হওয়া অনেকটাই প্রতিযোগীতাপূর্ণ হয়ে উঠে। ২০১৪ ও ২০১৫সালে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও ২০১৬ সাল বাদ যায়।

আবার ২০১৭ সালের ২০ শে জুলাই অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয হলো এইযে, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে কোন পরীক্ষা নিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এতেকরে বিশাল জট সৃষ্টি হয়।

যার ফলশ্রুতিতে হাজার হাজার শিক্ষানবীশদের জীবন আজ অনেকটাই দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে।বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষানবীশ আইন জীবির জীবন আজ দিশেহারা ও অধীর আগ্রহে পরীক্ষার জন্য প্রহর গুনছেন।

বাংলাদেশ বারকাউন্সিল অর্ডার এনডরুলস ১৯৭২ এর অনুচ্ছেদ- ১০ অনুসারে বারকাউন্সিলে প্রধান ও অন্যতম কাজ হলো অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তির কাজটি সম্পন্ন করা।তা তারা নিয়মিত করতে সম্পুর্ণ রূপে ব্যর্থ হয়েছেন ইতি মধ্যে তা প্রমানিত।অবশেষে, অপেক্ষার প্রহর শেষে ২০২০ সালে ফেব্রুয়ারী মাসের ২৮ তারিখে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় যেখানে প্রায় ৪০ হাজার পরীক্ষার্থী অংশ গ্রহন করে। এর মধ্যে মাত্র ৮৭৬৪ জন পাশ করে যার শতকরা হিসাবে ২২% ।অবার অনেকেই নানা জটিলতার কারণে পরীক্ষা অংশ গ্রহন করতে পারেননি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, পৃথিবীর কোথাও পরীক্ষানামক প্রহসন করে আটকে দেওয়ার এর কম নজির নেই। বাংলাদেশে আছে বা হচ্ছে।বিষয়টি শুধু হৃদয় বিদারকই নয় ,অনেকটা কর্তৃপক্ষের নিষ্ঠুর মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ বটে।বিভিন্ন
গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য শুধু হতাশ করেনি, একটা অনিশ্চিত যাত্রার দিকে এগিয়ে চলেছে আইন অঙ্গন।যা সত্যি দুঃখ জনক।আমরা পার্শবর্তী তথা এশিয়া মহাদেশের অন্যান্য দেশের এই তালিকা ভুক্তির প্রক্রিয়া যদি খেয়াল করি , দেখা যায় যে সেখানে আইনজীবি তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া এতটা সময় সাপেক্ষ নয়।

এমনকি বছরে কোন সময় পরীক্ষা হবে, তা সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ আছে। আমাদের দেশের বারকাউন্সিল একমাত্র ব্যতিক্রম।কিন্তু কেন? এ প্রশ্ন আজ আইন অঙ্গনের হাজারো মানুষের।যেখানে পরীক্ষার নামে কালক্ষেপন বৈ কিছুই নয়। অজুহাত দেওয়া হচ্ছে আইন জীবির সংখ্যা অনেক বেশী হয়ে গেছে। এই অকাট্য যুক্তি কতটুকু সঠিক ,তা সময় বিচার করবে। তবে এটা খুবই পরিষ্কার হাজার হাজার তরুন আগামীর আইন জীবির জীবন সংকটময় হয়ে দাড়িয়েছে। এর দায় কেনিবে ? বারকাউন্সিলকেই নিতে হবে বলে অনেকেই মনে করেন।

পরিবারের সদস্যের কিছু হলে কর্তা যেমন দায় এরাতে পারেন না, তেমিনি বারকাউন্সিলকে এর সমাধানের পথে হাটতে হবে।
বর্তমান করোনা মহামারীকালে অনেকটাই স্থবির গোটাবিশ্ব সেখানে বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। আর একারণেই এমসিকিউ উত্তীর্ণ প্রায় ১৩ হাজার পরীক্ষাথীরা গেজেট করে সনদ দেওয়ার দাবী তুলেছেন।যেহেতু করোনা কালীন সময়ে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভবনা।যদিও বা পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাহলে কমপক্ষে আরও ২ বছর লাগবে।

কারণ এমনিতেই বারকাউন্সিলের ১৮ মাসে বছর। তাই সমস্ত দিকবিচার বিশ্লেষণ করে, শিক্ষানবীশরা উক্ত দাবী তুলেছেন। এ দাবীতে শিক্ষানবীশরা গত ৭জুলাই থেকে বিভিন্ন উপায়ে আন্দোলন করে আসছেন। প্রসংগত দাবী আদায়ের জন্য তারা বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট প্রাঙ্গনে টানা এক সপ্তাহ অবস্থান করেন। যেখানে সারা বাংলাদেশের ৮১ টি বার থেকে কয়েক হাজার শিক্ষানবীশ অংশ গ্রহন করে। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় ।

সুপ্রীমকোর্ট প্রাঙ্গণে তারা বারকাউন্সিলের বর্তমান অস্থায়ী অফিস বোরাক টাওয়ারের সামনে অবস্থান নেন এবং এ দাবীতে আন্দোল চালিয়ে যেতে থাকেন। এরই ধারা বাহিকতায় গত ১৯ শে জুলাই রবিবার সম্মিলিত শিক্ষানবীশ আইনজীবি পরিষদ সনদের দাবীতে মহাসমাবশের ডাক দেয়। যদিও কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙেনি, আর ভাঙবে কিনা অনেকটাই প্রশ্নাতীত।এ দাবীর পক্ষে বিপক্ষে বক্তব্য আসলেও একটা বিষয় সবাইকেই নাড়া দিয়েছে, তা হলো নিয়মিত তালিকা ভুক্তির পরীক্ষা না হওয়া।

যার ফলে আজকের ভয়াবহ অবস্থা।আর এতে অনেক শিক্ষানবীশ পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য কাজের সাথে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।স্বাধীনদেশে এর কম অব্যববস্থাপনার নজির সত্যি করুণ। যখন অনিয়ম নিয়ম হয়ে দাড়ায়, রুখে দাড়ানো অনিবার্য।নতুবা একদিন এরফল সকলকেই ভোগ করতে হবে।

শিক্ষানবীশদের একজন আপসোস করে বলছিলেন, – আমি বারকাউন্সিলে রেজিষ্ট্রেশন করি ২০১৭ সালের ৩‘১শে মে, যার ২মাস পর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, যেহেতু ৬ মাস অতিক্রান্ত হয়নি, তখন পরীক্ষা দিতে পারিনি।

পরবর্তীতে আর সহসা পরীক্ষাই হল না। অর্থাৎ  প্রায় চার বছর কেটে গেল আমার জীবন থেকে শিক্ষানবীশের তকমালা গিয়ে।যদি সময় মত পরীক্ষা হতো ,হয় তো আমি আইনজীবির তালিকায় নামটা লেখাতে পারতাম।আমার এ অবস্থার জন্য দায়ী কে ?

উল্লেখ্য যে, রেজিষ্ট্রেশনের মেয়াদ ৫ বছর অর্থাৎ একটি মাত্র পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করে রেজিষ্ট্রেশন কার্ড এর মেয়াদ প্রায় শেষের পথে।এভাবে কর্তৃপক্ষের অবহেলার দরুণ এত গুলো বছর জীবন থেকে চলে গেল এরকম হাজার হাজার তরুণের।
খ্যাতিমান সাংবাদিক ও সংবিধান গবেষক মিজানুর রহমান যখন বারকাউন্সিলের মাননীয় সভাপতি জনাব এটর্ণী জেনারেল মাহবুব আলমের কাছে পরীক্ষার দীর্ঘ সূত্রী তার ও সনদের ব্যাপারে শিক্ষানবীশদের আন্দোলনের নিয়ে জানতে চাইলেন।

উত্তরে তিনি বললেন,বারে আইনজীবিদের বসার যায়গা নেই, তাছাড়া প্রতিবছর হাজার হাজার আইনজীবি আসছে।এভাবে সনদ দেওয়ার নজীর নেই এবং তা করতে গেলেও আইন সংশোধন করতে হবে।তাই এ দাবী সূদূর পরাহুত। কথাগুলো কতটুকু যৌক্তিকতা আগামীর আইনজীবিদের ভাবিয়ে তুলেছে।তারা বলছেন কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছথেকে এরকম বক্তব্য খুবই দুঃখজনক।

উল্লেখ্যযে, ২০১৭ সালে যারা লিখিত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন, তাদের অবস্থা খুবই হতাশা জনক। উনারা প্রায় ৫-৭ বছর অপেক্ষা করেও পরীক্ষা দিতে পারছেন না। সেই সাথে তারা একটা বিষয় দুঃখের সাথে বলেছেন – লিখিত পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়ে।এখনও এনালগ পদ্ধতিতে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়। যার ফলে উপরের পৃষ্ঠা কেটে অন্য কারো নামে চালানো খুবই সহজ কাজ।যা প্রকারান্তরে দুনীতির স্পষ্টচিহ্ন মাত্র।

আজ কাল সব যায়গায়ও এমআর পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাহলে এখানে কেন নেওয়া হচ্ছে না? এটা একটা বড় প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় কথা হলো ওএমআর থাকলে খাতা পরিবর্তন সম্ভব নয়। যা কম্পিউটারের মাধ্যমে প্রত্যেকের খাতা চিহ্নিত করে থাকে।এতে পরীক্ষার্থীরা নিশ্চিত মনে পরীক্ষা দিতে পারে।আর বর্তমান পদ্ধতি বহাল থাকলে, কি হবে বা হতে পারে, তা সহজে অনুমেয়। সুতরাং ওএমআর সংযুক্ত পরীক্ষা পদ্ধতি সময়ের যৌক্তিক দাবী বলে উল্লেখ করেছেন শিক্ষানবীশ আইনজীবিরা।

প্রবাদ আছে- সর্বাঙ্গে ব্যাথা ঔষধ দিব কোথা, আমাদের হচ্ছে এই অবস্থা।তাহলে এ অবস্থা থেকে কি উত্তরণের কোন উপায় নেই? আইন অঙ্গনের দীর্ঘ এই পরীক্ষা জট কি খুলবেনা? এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে শিক্ষানবীশদের মনে। তাহলে এই তরুনরা কোথায় যাবেন ? তাছাড়া আইনের গ্র্যাজুয়েটদের অন্যত্র যাবার তেমন একটা সুযোগ নেই, যদিনা সনদ না পায়। বারকাউন্সিলই একমাত্র অবিভাবক।

সুতরাং কর্তৃপক্ষই পারেন এই ব্যবস্থা থেকে উত্তরণ.ঘটাতে। কিভাবে করবেন তা উনারাই ভাল জানেন।প্রায় ১৩ হাজার সনদ প্রার্থীর বিষয়টা বিবেচনা করে স্বল্প সময়ের ম্ধ্যে দ্রুত সমাধানের পথে হাটবেন এটাই সকলের প্রত্যাশা। রাতের অন্ধকার কেটে যাবে, ভোরের সোনালী আলো ফুটবে এরই অপেক্ষায় হাজারো শিক্ষানবীশ।

 

Development by: webnewsdesign.com