ব্রেকিং

x

আফগান যুদ্ধে অংশ নিতে বাংলাদেশের ২০ যুবক নিখোঁজ!

সোমবার, ১৬ আগস্ট ২০২১ | ৮:৪২ অপরাহ্ণ |

আফগান যুদ্ধে অংশ নিতে বাংলাদেশের ২০ যুবক নিখোঁজ!
ছবি : অনলাইন

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে ২০ জনের মতো যুবক নিখোঁজ হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। তারা কোথায় আছে বা কী করছে তার কোনো হদিস নেই। এমনকি নিখোঁজ যুবকদের পরিবারও তাদের খোঁজ পাচ্ছে না। এরা সবাই নব্য জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর আশঙ্কা আফগানিস্তানে জিহাদে অংশ নিতে চলে যেতে পারে তারা। তবে তারা কীভাবে যাওয়ার চেষ্টা করছে বা চলে গেছে তার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছে পুলিশ। এসব ঘটনার পর নিখোঁজদের পরিবারের ওপরও নজরদারি করছে পুলিশ। পাশাপাশি সম্প্রতি ভারতের কলকাতায় গ্রেপ্তার হওয়া ৩ জঙ্গিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে তোড়জোড় শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) শফিকুল ইসলাম, গোয়েন্দা সূত্র এবং গণমাধ্যম প্রকাশ হওয়া সংবাদের প্রেক্ষিতে এমনটাই জানা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত আশির দশকে আফগানযুদ্ধে অংশ নিতে বাংলাদেশ থেকে একাধিক জঙ্গি গিয়েছিল। মিশন শেষ হওয়ার পর বেশিরভাগ জঙ্গি দেশে ফেরত এসেছে। তাদের মধ্যে ১০-১২ জন কারাগারে আটক থাকলেও বাকিদের হদিস নেই। গত কয়েক দিন ধরে বিষয়টি আলোচনায় আসার পর ১৪ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলেন ডিএমপি কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আফগান যুদ্ধে অংশ নিতে ইতোমধ্যে অনেকে দেশ ছেড়েছেন। অনেকে রাস্তায় আছেন আবার অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে ভারতে রয়েছেন। সীমান্তে তাদের কেউ সহায়তা করেছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা থেকে বোমার সরঞ্জাম কিনে বান্দরবানের থানচি পাহাড়ে হিজরত করে ৪ মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছে সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া নব্য জেএমবির ৩ সদস্যসহ শতাধিক তরুণ। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে নব্য জেএমবির সামরিক শাখার প্রধান ফোরকান। তার সঙ্গে আফগানফেরত জঙ্গিদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। আফগানে আসা যাওয়া জঙ্গিদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে সে। গত মঙ্গলবার ঢাকার কাফরুল থেকে ফোরকানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, গত ৬ মাসে ২০ জনের মতো যুবককে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত বলে তথ্য পেয়েছি। নিখোঁজদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের বিষয়ে তথ্য দিয়েছে ফোরকান। আমরা আশঙ্কা করছি, নিখোঁজরা ভারত বা পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তান চলে গেছে। তারপরও আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।

পুলিশ সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করা সিটিটিসি প্রথম বিষয়টি আঁচ করতে পারে। তারপর তারা এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়কে অবহিত করে। বিষয়টি নিয়ে তদন্তের এক পর্যায়ে দেশছাড়া তরুণদের সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এরপর তাদের বিষয়ে পাশের একটি দেশকে বিস্তারিত জানানোর পর সেখানে কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়। বাকি সদস্যদের সন্ধান করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, পাশের দেশে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের দ্রুতই দেশে ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে। তার আগে তাদের সম্পর্কে তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। এমন পরিস্থিতিতে তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। কীভাবে তারা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ল সে বিষয়েও বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি সিটিটিসির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ফোরকানের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন ও ট্যাব থেকে জঙ্গিদের দেশ ছেড়ে আফগান যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিশদ তথ্য পাওয়া গেছে। তার দেওয়া তথ্যমতে দেশের আরও একাধিক জঙ্গিকে নজরদারির আওতায় আনা হয়। যারা আফগানিস্তানের উদ্দেশে দেশ ছেড়েছে বা ছাড়ার চেষ্টা করছে তাদের প্রোফাইল সংগ্রহ করা হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে নব্য জেএমবির সদস্যদের পাহাড়ে হিজরত কার্যক্রমের কথা জানিয়েছে। এমনকি অনলাইনে তরুণদের হিজরত করতে আফগানিস্তানে তালেবানদের সঙ্গে যুদ্ধে যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে আলোচিত জিহাদি বক্তা আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনানের ওয়াজের প্রভাবের তথ্যও উঠে এসেছে। তার সম্পর্কেই মিলছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। নব্য জেএমবি সদস্য মো. কাউসার হোসেন ওরফে মেজর ওসামা, সাইফুল ইসলাম মারুফ ওরফে বাসিরা ও মো. রুম্মান হোসেন ফাহাদ ওরফে আব্দুল্লাহসহ বহু তরুণ পাহাড়েই থাকা-খাওয়াসহ সাংগঠনিক সব ধরনের কার্যক্রম চালায়। নির্জন স্থানে ট্রেনিং চালাত। সেখান থেকেই তাদের নেতাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখে। তারা পাহাড়ে স্থায়ীভাবে থাকা ও প্রশিক্ষণের জন্য জমি কেনার চেষ্টাও করছিল। রংপুরের বাসিন্দা আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনান এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ‘নিখোঁজ’ থাকার পর গত ১৮ জুন উদ্ধার হন। পরে পুলিশ জানায়, ত্ব-হা তার তিন সঙ্গীসহ ‘ব্যক্তিগত কারণে’ আত্মগোপন করেন। ওই সময় পুলিশ ও ত্ব-হার পরিবারের পক্ষ থেকে এই নিখোঁজ সম্বন্ধে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।

পাহাড়ি এলাকায় হিজরত থেকে ফিরে সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া নব্য জেএমবির এক সদস্য জিজ্ঞাসাবাদে সিটিটিসির তদন্ত কর্মকর্তাকে জানায়, বান্দরবানের থানচিতে টিঅ্যান্ডটি এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে জঙ্গি সংগঠনের পড়াশোনা করে সে। সেখানে সে ৪ মাস অবস্থান করে। দলের নেতাদের পরামর্শে প্রশিক্ষণের জন্য জায়গা খোঁজা শুরু করে।

সিলেটের রাজ্জাক আফগানিস্তানে

সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েক জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা জানায়, তাদের অনেক বন্ধু কথিত হিজরতের নামে আফগানিস্তান গেছে। তাদের মধ্যে রাজ্জাকও রয়েছে। রাজ্জাকের ছবি দেখে তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেন। রাজ্জাকের গ্রামের বাড়ি সিলেট। গত ২৫ মার্চ থেকে রাজ্জাক নিখোঁজ ছিল। নিখোঁজ থাকায় ১ এপ্রিল সিলেটের কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তার বড় ভাই সালমান খান। জিডির সূত্র ধরে তদন্ত করা হয়। আমরা অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয়েছি রাজ্জাক আফগানিস্তানে চলে গেছে।

তিনি আরও বলেন, রাজ্জাক সিলেট সীমান্ত দিয়ে প্রথমে ভারত যায়। পরে পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তান যায়। রাজ্জাকের পরিবারকে নজরদারি করা হচ্ছে। রাজ্জাক লামাবাজার এলাকায় একটি কলেজে এইচএসসিতে পড়ে। সে নিয়মিত নামাজ পড়ত বলে তার ভাই আমাদের জানিয়েছেন। তার কয়েক বন্ধুও আছে। আমরা ধারণা করছি, তারাও আফগানিস্তান চলে গেছে।

গত শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেছেন, অনলাইনে জঙ্গিরা কর্মী সংগ্রহ ও উদ্বুদ্ধ করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তালেবানের পক্ষ থেকে আফগানিস্তানে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। আর বাংলাদেশ থেকে কিছু মানুষ ইতোমধ্যে তালেবানদের সঙ্গে যুদ্ধে যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ হয়েছে। আমরা ধারণা করছি, কিছু মানুষ ভারতে ধরা পড়েছে, আর কিছু হেঁটে বিভিন্নভাবে আফগানিস্তানে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গি ফোরকান বোমা বিশেষজ্ঞ। অনলাইনে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিত। নারায়ণগঞ্জে শক্তিশালী বোমা উদ্ধার হয়েছে, সেটাও তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে তৈরি করা। এ মাসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জঙ্গি বা নাশকতাকারী গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সিটিটিসি প্রধান এবং উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, আলোচিত ধর্মীয় বক্তা আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনানের ওয়াজ শুনে উদ্বুদ্ধ হয়ে বান্দরবানের পাহাড়ে হিজরত করেন নব্য জেএমবির একাধিক সদস্য। তাদের তালিকা আমাদের কাছে রয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা রিমান্ডে রয়েছে। এছাড়া আবু ত্ব-হার বিষয়েও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্ত তদারক সূত্র জানায়, সম্প্রতি জঙ্গিদের একটি তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের নাম। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন জামিনে মুক্ত হয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছে। সিরিয়ায় উগ্রপন্থি ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নেতা ব্রিটিশ নাগরিক সামিউন রহমান ইবনে হামদান ২০১৪ সালে ঢাকায় ‘মুজাহিদ’ সংগ্রহে এসে গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে মামলার পর ২০১৭ সালে আদালত থেকে জামিন পান। এরপর থেকেই লাপাত্তা তিনি।

Development by: webnewsdesign.com