ব্রেকিং

x

ইরানী বিশ্বাস-এর গল্প ‘অহংকার’

সোমবার, ০৪ জানুয়ারি ২০২১ | ১:৫১ অপরাহ্ণ |

ইরানী বিশ্বাস-এর গল্প ‘অহংকার’

ছুটির দিন। তাই কোন কাজে তেমন তাহাহুড়া নেই। সকালে একটু বেলা করেই ঘুম ভেঙ্গেছে। নাস্তার টেবিলে রোজকার মতো পত্রিকার পাতায় চোখ ডুবিয়ে প্লেটের খাবার শেষ হচ্ছে।
সবে মাত্র লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে চাকরিতে জয়েন করেছে। বয়স কম হলেও দায়িত্বটা অনেক বড়। চেহারার সঙ্গে অনেকটা বেমানান। তাতে কি বর্তমান সময়ে অনেকেই ভাল পোস্ট নিয়ে কাজ করছে। তাদের মধ্যে চয়ন এ রকমই একজন। পত্রিকায় একটা বিশেষ প্রতিবেদন পড়তে পড়তে অয়নের চোখ আটকে গেল। ফ্লোরা নামের একটি মেয়ে নবীন লেখকদের মধ্যে সেরা হয়েছে। দেশের একটি নামকরা কোম্পানীর আয়োজনে এই পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। মেয়েটির চেহারার মধ্যে কেমন একটা মাদকতা আছে। ছবির মধ্যেই চোখ আটকে গেছে। মনে মনে দেখার লোভ হচ্ছে। যে করেই হোক ফ্লোরাকে দেখতে চায় চয়ন চৌধুরী। ক্রমেই দেখার ইচ্ছা যেন বেড়েই চলছে। কিছুক্ষন ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হলো, অফিসে একটা ছেলে পলাশ, মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত। যদি ওকে ফ্লোরা সম্পর্কে জানতে চাই, তাহলে কেমন হয়।
কালো গাড়ির গøাস খুলে দাঁড়িয়ে আছে ড্রাইভার। চয়ন খোশ মেজাজে সানগøাসটা খুলে হাতে নিয়ে এগিয়ে যায় লিফটের দিকে। যথাসময়ে লিফটের দরজা খুলে যায় ঠিক পঞ্চম তলার সামনে। অফিস রুমে ঢুকতেই সকলের সালাম আর সেলুটে নিজের চেয়ারে পিঠ ঠেকায় চয়ন চৌধুরী। হাতের কাছে কলিং বেলে আওয়াজ শুনে ছুটে আসে পিয়ন। মুখে গম্ভীর ভাব বজায় রেখে হাতের কাছে কাগজে সাইন করতে করতে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
একটু দেখো তো পলাশ সাহেব এসেছেন কি না?
জ্বী স্যার।
পিয়ন মাথা নিচু করে চলে যায়। চয়ন একটু আড় চোখে তাকায় পিয়নের চলে যাওয়ার দিকে। সামনে ক্রিস্টাল কাঁচের গøাসের ঢাকনা সরিয়ে ঢক ঢক করে জল খেয়ে নেয়। এরই মধ্যে দরজায় পার্মিশান নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে পলাশ সাহেব। যদিও অফিসে শার্ট-টাই-সু পরে আসার নিয়ম তবু পলাশ সাহেবের যেন নিয়ম ভাঙ্গাই নিয়মে দাঁড়িয়েছে। পলাশ দুরু দুরু মনে সমনে এগিয়ে যায়। মনে মনে ভাবছে, হয়তো ড্রেসকোড নিয়ে আজও তাকে বকা শুনতে হবে। কিন্তু না চয়ন চৌধুরী পলাশের মুখের দিকে না তাকিয়ে গতকালের পুরানো পত্রিকার একটি পাতায় চোখ নামিয়ে রেখেছেন। তারপর বেশ হাসি হাসি মুখে বললেন,
– আচ্ছা পলাশ সাহেব, আপনি লেখালেখি করেন না?
– জ্বী স্যার। কোন প্রবলেম..
– না না। প্রবলেম কি। বরং ভালই তো, আমাদের অফিসে আপনার মতো একজন গুনী মানুষ কাজ করেন।
– স্যার..কোন প্রবলেম..?
– কি – প্রবলেম, প্রবলেম বলছেন। আপনি ফ্লোরাকে চেনেন? কাল যে মেয়েটি নবীন লেখকদের মধ্যে সেরা পুরস্কার পেয়েছেন?
– চিনিতো। নতুনদের মধ্যে ও খুব ভাল করছে।
– আপনি তাকে চেনেন! একদিন আমাদের অফিসে তাকে ইনভাইট করেন।
– স্যার..আমাদের অফিসে?
– হ্যাঁ। মনে করেন তার উপলক্ষ্যে..একদিন ডিনার পার্টি হলো।
কিছুক্ষন চুপ থেকে চয়ন চৌধুরী বললেন, আচ্ছা অফিসে না হয়ে যদি কোন রেস্টুরেন্টে হয়। তাহলে কি তিনি আসবেন? পলাশ বুঝতে পারছে না, তার কি বলা উচিত। হঠাৎ করে এই গুরুগম্ভীর মানুষটি সাহিত্যপ্রেমী হয়ে উঠেছে কেন? তারপরও কিছুতো একটা বলতে হবে। তাই পলাশ সাহেব বললেন, ঠিক আছে স্যার। আমি ফ্লোরাকে বলবো। পলাশের কথায় বাঁধা দিয়ে চয়ন চৌধুরী বললেন, আরে বলবো মানে কি, নিয়ে আসবেন। পারবেন না? এক মুহুর্তের মধ্যে পলাশ যেন বোবা হয়ে গেল। তিনি মনে মনে ভাবছেন, কি বলছেন চয়ন চৌধুরী তিনি তো কিছুই বুঝতে পারছেন না। দুজনের কথা শেষ করে যে যার কাজে ফিরে গিয়ে কাজে মনোযোগী হয়ে ওঠে।
অপেক্ষার প্রহর শেষ করে ঘনিয়ে এসেছে সেই মুহুর্ত। সারাদিন অফিসে কাজ শেষ করে চয়ন চৌধুরী অপেক্ষা করছে একটি রেস্টুরেন্টে। নীল আলোর মধ্যে নিজেকে যেন চিনতে পারছেন না চয়ন চৌধুরী। ফ্রেশরুমে গিয়ে চেহারাটা আরো একবার পলিশ করে নিতে ভুল করেননি তিনি। গায়ে বিদেশি পারফিউমের তীব্র গন্ধ চারিদিকে ম ম করছে। টেবিলে বিছানো প্লেট-গøাস নাড়িয়ে দেখছেন তিনি। কয়েকটি পায়ের শব্দ শুনে সেদিকে তাকিয়ে দেখছেন পলাশের সাথে একটি মেয়ে ঢুকেছে সেখানে। মেয়েটি খুবই নরমাল কিন্তু স্মার্ট।
সেই থেকে শুরু। ফ্লোরাকে ভালবাসার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করতেই সে যেন কেমন নেতিয়ে গেল। শুরু হলো ওদের ভালবাসার প্রহর। হেসে খেলে কেটে যেতে লাগলো দুজনের দুটি জীবন। এরই মধ্যে ফ্লোরার পরিচিতি অনেক বেড়ে যেতে লাগলো। বিভিন্ন পত্রিকা থেকে লেখার জন্য তাগাদা দিতে লাগলো। একুশে বই মেলার জন্য প্রকাশক ধন্যা দিতে থাকে। কিন্তু ফ্লোরা যেন সব ছাপিয়ে চয়নের প্রেমে হাবুডুবু খেতে লাগলো। দুজনে সুযোগ পেলেই রেস্টুরেন্টে খাওয়া, ঘুরে বেড়ানো নিত্য দিনের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মোবাইল বেজে ওঠে। দেয়াল ঘড়ির দিকে চোখ তুলে তাকায়। রাত ১ টা বাজে। একটু বিরক্তি নিয়ে হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা হাতে নিয়ে রিসিভ করে চয়ন চৌধুরী
– হ্যালো, কি ব্যাপার এত রাতে?
– বাইরে প্রচন্ড আলো..
– আলো ! কিসের আলো?
– চাঁদের আলো। আজ পূর্নিমা। দেখো কতো বড় চাঁদ উঠেছে।
– চাঁদ উঠেছে? আজ পূর্নিমা, চাঁদ তো উঠবেই।
– একটু বারান্দায় যাবে?
– কেন?
– তোমার বারান্দা, আমার বারান্দা ভিন্ন কিন্তু কি অদ্ভুত ব্যাপার বলোতো, আমাদের দুজনের একটাই চাঁদ।
– কি সব আবোল তাবোল বলছো। এটাতো সবাই জানে, চাঁদ একটাই হয়। এক কাজ করো তুমি বারান্দায় গিয়ে দেখো। তারপর কাল সকালে তোমার কাছথেকে শুনে নেবো কি কি দেখলে। ঠিক আছে?
– কি বলছো তুমি? তুমি যাও না..প্লিজ। বারান্দায় আমার সাথে একটু বসবে। তারপর আমরা চাঁদ দেখবো। দুই বারান্দা, দুইজোড়া চোখ একই আকাশে একটাই চাঁদ।
– ফ্লোরা তুমি একটু লাইনটা কেটে দাওতো। আমার একটা ইম্পর্টেন্ট ফোন এসেছে।
ফ্লোরা লাইনটা কেটে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। চয়ন আবার ফোন করবে, তারপর ওরা কথা বলতে বলতে আজ পূর্নিমার চাঁদ দেখবে। মিনিট থেকে ঘন্টা পার হয়ে এখন রাত ৩ টা বাজে। মন খারাপ করে বসে বসে কেটে গেল ফ্লোরার আকাঙ্খিত রাত। যে রাতে সে চাঁদ দেখতে চেয়েছিল। না, কোন দুরবিনে চোখ রেখে নয়। ভালবাসার দুটি চোখে ভর করে মাত্র কয়েক মুহুর্তের জন্য চেয়েছিল ভালবাসার কাঙ্খিত ভরাপূর্নিমার রাতে একটি চাঁদ দুজনে ভাগ করে দেখবে। যদিও স্থান ছিল ভিন্ন তবু একটি আকাশে একটি চাঁদ দেখার আনন্দ ভাগ করে নিতে চেয়েছিল ফ্লোরা। খুব কি বেশি কিছু চেয়েছিল ফ্লোরা?
সকাল গড়িয়ে দুপুর। ফ্লোরার মোবাইলে চেনা মানুষটির কল এখনো আসনি। কতো শত কল এসেছে। প্রত্যেকবারে সে মনে করেছে, এই বুঝি কল এসেছে। প্রত্যেকবারেই নিরাশ হয়েছে ফ্লোরা। দুপুর গড়িয়ে রাত। মনে মনে অভিমানে চোখ ফুলে গেছে জলধারায়। তবু কি চয়ন ফোন করবে না? অভিমানের প্রহর শান্ত করে ফ্লোরা নিজেই সেন্ড বাটন চেপে কল করে চয়ন চৌধুরীর নম্বরে। চয়ন প্রথম কলটা কেটে দেয়। ফ্লোরা কিছুক্ষন অপেক্ষা করে হয়তো কল ব্যাক করবে। না সেকেন্ড থেকে মিনিট পার হয়ে ৩০ মিনিট। কোন কল আসে না। ফ্লোরা মনে করে, হয়তো নেটওয়ার্কের বিড়ম্বনা। চয়ন হয়তো কলটি পায়নি। তাই মনের অভিমান দুর করে আবার কল করে। এবারও কলটি কেটে দিয়ে একটি টেক্স পাঠিয়েছে। বিজি আছে, পরে কথা হবে। ফ্লোরার মন বিষন্নতায় ভরে ওঠে। কি এমন জরুরি কাজ। কাল রাতের পর থেকে একবার খোঁজ নেবার সময় হয়নি। কি হতে পারে? মনে মনে অনেক কথার শাখা-প্রশাখা আবিস্কার করে। তারপর মুখ ভারি করে না খেয়ে বিছানায় পড়ে আছে।
রাত ১০ টা। ফ্লোরার মোবাইলে একটি কল আসে। চয়নের নাম দেখে খুশি হয়। আবার অভিমানে মন ভারি করে রিসিভ করে
– কল না দিলেই তো পারতে।
– এভাবে কথা বলছো কেন?
– কিভাবে বলবো তাহলে?
– তুমি তো জিজ্ঞেস করবে প্রথমে, আমি কেমন আছি, কোথায় আছি?
– এটা কি তোমার অভিযোগ? নাকি..
– তুমি কি সব বলো আমি মাঝে মাঝে কিছুই বুঝি না। আচ্ছা বুঝতে পেরেছি সারাদিন কল করিনি তাই রাগ করেছো।
– আচ্ছা চয়ন, সত্যি কি তুমি বুঝতে পারো, আমার কিসে রাগ, অভিমান ..
– আগে শোন কি হয়েছে? আমি এখন চিটাগং। মর্নিং ফ্লাইটে চলে এসেছি জরুরি একটা কাজে। কাল রাতে তোমাকে বললাম না লাইন কেটে দিতে, তখন ..
– ব্যাস ব্যাস..আমাকে আর কৈফিয়ত দিতে হবে না।
– কৈফিয়ত কেন বলছো? তোমাকে জানানো আমার দায়িত্ব।
– সত্যি তোমার দায়িত্বজ্ঞান আছে?
– রাগ করো না প্লিজ।
– ধানমন্ডি থেকে এয়ারপোর্ট যেতে কম সময় লাগে না। এই টাইমে তুমি অন্তত একটা এস এম এস পাঠাতে পারতে।
– চিন্তা করেছিলাম একবার। ভুলে গেছি।
– তুমি আসলে আমাকে কখনো মনেই করো না।
– আচ্ছা ঠিক আছে, আমার ভুল হয়ে গেছে। এখন খুশি তো?
ফ্লোরা চিন্তা করে, কতো সহজে ভুল ¯¦ীকার করা যায়। আসলে এত সহজে ভুল গুলো ভুলে যাওয়া যায়? যায় না। সাদা কাগজে পেন্সিলের লেখা সহজেই উঠানো যায় কিন্তু কলমের কালির দাগ উঠানো যায় না। তার মনে পড়ে যায়, কতো শত ভুল। চয়ন কি সারা জীবন শুধু ভুল করে ক্ষমা চাইবে? কেন, তার ইচ্ছা হয়নি, ভুলগুলো যেন আর না হয়, বার বার একই ভুল কেন হবে।
একবার ফ্লোরা একটা গল্প লিখতে লিখতে মনে হলো চয়নের সঙ্গে আইসক্রিম খাবে। মনে হলো, জানাতে দেরি হলো না। লেখা বাদ দিয়ে ফ্লোরা একটা এসএমএস লিখে পাঠিয়ে দিলো, আমি আসছি অফিসে। চয়ন খুশি হলো, মনে মনে ভাবলো ভালই হলো, ওকে নিয়ে বিকালে ঘুরতে বের হবো।
যথারীতি ফ্লোরা এসে চয়নের সামনের চেয়ারে বসে আছে। ছোট বাচ্চাদের মতো উৎসুক চোখে চয়নের দিকে তাকিয়ে ফ্লোরা বয়না করে, আমি এখন আইসক্রিম খাবো। চয়ন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে,
– কি বলছো তুমি, এখন তো লাঞ্চ টাইম। আগে লাঞ্চ করো বিকালে আমি তোমাকে নিয়ে বের হবো। তারপর আইসক্রিম পার্লারে গিয়ে মন ভরে যত ইচ্ছা ততো খাবে, ঠিক আছে।
ফ্লোরা গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়ায়, না ঠিক নেই। আমি এখন খাবো। তুমি কেন বুঝতে পারছো না আমার তো এখনই আইসক্রিম খেতে ইচ্ছা করছে। ধমকের সুরে চয়ন বলে উঠে,
– কি হচ্ছে ফ্লোরা। এটা আমার অফিস। পাগলামী করার জায়গা না। তোমাকে শান্ত মেজাজে কথা বললে তুমি বুঝতে চাও না। কেন বলো তো?
– মনে করো এটা আমার স্বভাব। দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। এই জলের
অর্থ বুঝতে পারেনি চয়ন। অথবা বোঝার চেষ্টা সে কোন দিন করেনি।
সেদিন বিকালে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে চয়ন গিয়েছিল আইসক্রিম পার্লারে। ফ্লোরাকে মন ভরে আইসক্রিম খাওয়াবে। কিন্তু চয়ন কি কখনো ভেবে দেখেছে, সত্যি কি তখন ফ্লোরা আইসক্রিম খেয়েছিল? প্রয়োজন মানুষকে ভাললাগার অর্থ বোঝায়। মানুষ নিজের প্রয়োজনে অন্য আরো একজন মানুষকে ভালবাসে। তেমনি নিজের প্রয়োজনে খাবার, পোশাক বা অন্যান্য জিনিস ভালবাসে।
জীবনের কতো ছোট ছোট বিষয় কতো অসহ্য কঠিন বাস্তবে পরিনত হয়। ফ্লোরা চেয়েছিল এমন একজন মানুষ যে, ঝিলের জলে ভেসে ওঠা শাপলা পাতায় ফড়িংয়ের ওড়া দেখে বিমুগ্ধ হবে। তার সঙ্গে শেয়ার করবে ছোট ছোট খুশি। মেঘ ভাঙ্গা প্রথম সোনালী রোদের ঝিলিক দেখে হেসে ওঠে ফ্লোরা। কিছুতেই পারে না চয়ন চৌধুরীর গাম্ভীর্য্য আর অহংকারের রাজ্যে নিজেকে খাপ খাওয়াতে। তাই আস্তে আস্তে ফ্লোরার ভাললাগার আকাশে দুরত্বের ঘুড়ি উড়তে থাকে।

Development by: webnewsdesign.com