ব্রেকিং

x

করোনার প্রভাবে ঘরবন্দি নববর্ষের অর্থনীতি

শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২০ | ১১:১৫ পূর্বাহ্ণ |

করোনার প্রভাবে ঘরবন্দি নববর্ষের অর্থনীতি
ছবি- অনলাইন

ঋতুচক্রে সমাগত প্রথম ঋতু গ্রীষ্মকাল। তবে এটি শুধু একটি মৌসুমই নয়; বরং বাঙালিদের উৎসব ও ঐতিহ্যের সমারোহও বটে। আর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে চাঙ্গা অর্থনীতি এখন স্থবির হয়ে পড়েছে। করোনা ভাইরাসের প্রদুর্ভাবে বৈশি^ক অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব পড়েছে। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি এখন ঘরে আবদ্ধ হয়ে থাকার উপক্রম। যার ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীর পাশাপাশি মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অবস্থা নাজুক।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মতে প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দ্বীন, একাকী থাকলেও উৎসবে দিন হয়ে উঠে বৃহৎ ও মনুষ্যত্বের অনুভূতি হয় মহৎ। আর বাঙালির ঐহিত্যবাহী এই উৎসবে কোনো ধরনের কার্পণ্য করেন না ধর্ম, গোত্র, পেশাজীবীরা। কিন্তু চলতি বছরে করোনা ভাইরাসের কারণে এই উৎসবে ভাটা পড়তে পারে তা সকলেই আঁচ করতে পেরেছিল। তবে গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নববর্ষের সব উৎসব স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। সবাই এর সমর্থন করলেও বৈশাখ উপলক্ষে অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্য যে এখন ঘরে আবদ্ধ করে ফেলেছে তা অস্বীকার করার জো নেই। যার ফলে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি এখন অনেকটাই স্থিমিত হয়ে পড়েছে।

তিন বছর ধরে বৈশাখী অর্থনীতির সাথে যুক্ত হয়েছে নববর্ষের বোনাস। যার ফলে চলতি মার্চ মাসে অতিরিক্ত ৬০০ কোটি টাকা বোনাস পাবেন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। যে বোনাসের পুরোটার পাশাপাশি বেতনেরও অনেকটা খরচ করে এই পহেলা বৈশাখ উৎযাপনে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্যানুসারে দেশে গত বছর দোকানগুলোয় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে। পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় আবেদন পাঞ্জাবি ও শাড়ি গত বছরে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে পাঞ্জাবি ও শাড়ি বাবদ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। বাংলাদেশেুর ক্ষুদ্র কুটির ও ফ্যাশন উদ্যোক্তাদের মতে দেশে মোট বিক্রির ২৫ শতাংশই হয় পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে। বাকি ৫০ শতাংশ ঈদ ও অন্যান্য উৎসব এবং বাকিটুকু সারাবছর ধরে হয়ে আসছে।

কিন্তু এই ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের কোনো লেনদেন এবারের বৈশাখে হবে না সেটা সহজেই বোঝা যায়। ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতির সভাপতি তৌফিক এহসান বলেন, অগ্রীম মালামাল ক্রয় করেছে অনেক দোকানদার। কিন্তু নববর্ষে কোনো লেনদেন হবে না এটা বোঝা গেছে। ঢাকায় ৩৭টি বাজারের সাথে যুক্ত আড়াই লাখ শ্রমিক এখন পুরোপুরি অলস সময় কাটাচ্ছেন। এই ক্ষতি সাধারণ বিক্রেতারা পোষাতে পারবে না।

দেশীদশের সাদাকালো ব্র্যান্ডের কর্ণাধার আবুল কালাম আজাদ বলেন, শাড়ির চাহিদা পহেলা বৈশাখে সবচেয়ে বেশি থাকে। এ ছাড়া পাঞ্জাবিসহ দেশীয় সংস্কৃতির সাথে মানানসই পোশাক এই সময় বিক্রি বেশি হতো। কিন্তু এই পুরো ব্যবস্থাটাই স্থিমিত হয়ে গেছে। তিনি জানান, দেশের সার্বিক ফ্যাশন উদ্যোক্তাদের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হবে চলতি বছরে নববর্ষের বাজার না থাকার কারণে।

সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন, নববর্ষে বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন এক দিকে মোড় নিয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরে না হওয়ার কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরদেও অপূরণীয় ক্ষতি হবে। যদিও ক্রেতাদেও হাতে অর্থের জোগান থাকবে; কিন্তু চাহিদা না থাকায় বিক্রেতারা অন্য পণ্যের দাম বৃদ্ধি করে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। যার ফলে বাজার ব্যবস্থাও খারাপ হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

এ ছাড়া পহেলা বৈশাখে রাজধানীতে প্রতিদিন পাইকারি বাজারে ৩০-৩৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হয়। সে হিসেবে পহেলা বৈশাখকে ঘিরে ৬০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে গত বছর। কিন্তু গতকাল মাত্র ১ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হয় বলে জানায় শাহবাগের পাইকারি ফুল বিক্রেতা সংগঠন। সে হিসেবে পহেলা বৈশাখে কয়েকগুণ ক্ষতি হবে সে দুশ্চিন্তায় আছে তারা। ফুলের পাশাপাশি নিমন্ত্রণ ও শুভেচ্ছাপত্রের ব্যবসায়ও ভাটা পড়েছে। প্রতিবছরে ৩০-৪০ কোটি টাকার নিমন্ত্রণপত্র বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত করত। কিন্তু চলতি বছরে যারা অর্ডার দিয়েছে তারা এখন তা স্থগিত রেখেছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

এমন ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানানো হয়। এ নিয়ে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শিল্প, বাণিজ্য, শ্রমসহ ৫ জন সচিব বৈঠকে বসেছিলেন। বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, করোনা ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা। শুধু পোশাক খাতে না দিয়ে একটি সমন্বিত প্রণোদনা তহবিল গঠন জরুরি।

এদিকে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মেলা ও অনুষ্ঠান বাতিল ঘোষণা করা হয়। বিসিক ১০ দিনব্যাপী ক্ষুদ্র ও কুটির মেলার আয়োজন করে বাংলা একাডেমিতে। করোনা ভাইরাসের কারণে তা স্থগিত করে দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে বিসিকের পরিচালক মোস্তাক হাসান বলেন, বাংলা একাডেমির মেলা হচ্ছে না। সারাদেশে ৭৬টি শিল্পনগরীর মেলাও স্থগিত হয়েছে।

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সুদের হার বন্ধ রাখার পাশাপাশি দোকান ভাড়া, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল মওকুফের কথা বলেছেন। এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

Development by: webnewsdesign.com