ব্রেকিং

x

জীবন থেকে নেয়া

রবিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২১ | ৫:১৭ অপরাহ্ণ |

জীবন থেকে নেয়া
সংগৃহীত ছবি

১৯৭০ সালের ১০ এপ্রিল মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল ‘জীবন থেকে নেয়া’ -এর। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয় শুটিং। তার পরপরই এক সাক্ষাৎকারে পরিচালক জহির রায়হান জানান, ছবিটি বানাচ্ছেন গণআন্দোলনের পটভূমিতে। তখন থেকেই এর বিরুদ্ধে শুরু হয় সামরিক প্রশাসনের ষড়যন্ত্র।

নিয়ম-কানুন দিয়ে কোনোভাবেই না পেরে শেষে গায়ের জোরেই সিনেমাটি আটকে দেয় পাকিস্তানি সামরিক জান্তা সরকার। প্রতিবাদে রাজপথে নামে বিক্ষুব্ধ জনতা। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে রীতিমতো মিছিল হয়। সেন্সর ছাড়পত্র দিতে বাধ্য হয় প্রশাসন। পরদিন মুক্তি পায় ছবিটি। বিভিন্ন হলে চলে মোট ২৫ সপ্তাহ।

‘জীবন থেকে নেয়া’-এর পরে আবারও ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ (অসমাপ্ত)-এর কাজ শুরু করেন জহির রায়হান। ওদিকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। তারপর আসে ১৯৭১। শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই ভাই নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নেন। শহীদুল্লাহ কায়সার থেকে যান ঢাকায়, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে। আর জহির রায়হান ভারতে যান যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে। ২১ এপ্রিল কুমিল্লা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। প্রথমে যান আগরতলায়। সেখান থেকে কলকাতা।

উদ্যোগ নেন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পাকিস্তানি বর্বরতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার। এরই মধ্যে খবর পান, ‘জীবন থেকে নেয়া’-এর একটি রিল এসেছে কলকাতায়।

রিলটা এনেছিলেন রংপুরের এক হল মালিক। তিনি পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন শরণার্থী হয়ে। সঙ্গে করে আনেন ‘জীবন থেকে নেয়া’-এর একটা পুরনো রিল। কলকাতায় এসে যোগাযোগ করেন এক ডিস্ট্রিবিউটরের সঙ্গে।

সেখানকার হলে চালানোর জন্য। খবর পেয়ে জহির রায়হান নিজেই যোগাযোগ করেন সেই ডিস্ট্রিবিউটরের সঙ্গে। অনুরোধ করেন, প্রাপ্য টাকাটা যেন তাকে দেওয়া হয়। ডিস্ট্রিবিউটর তাতে সহজেই রাজি হন।

কিন্তু অন্য একটা বিষয়ের সুরাহা তখনো বাকি। ভারতে চালাতে হলে ‘জীবন থেকে নেয়া’-এর ভারতীয় সেন্সর ছাড়পত্রের প্রয়োজন। সেটা তখনো করানো হয়নি। তার জন্য অবশ্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষই আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসেন।

কারণ, তাঁরা এটিকে বিবেচনা করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একটি চালচ্চিত্রিক পটভূমি হিসেবে। এমন একটা ছবি মুক্তি পেলে তাঁদেরই লাভ। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের প্রচারণাটা তাতে আরো দৃঢ় হবে।

কাজেই দ্রুত ‘জীবন থেকে নেয়া’র সেন্সর ছাড়পত্র প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সে দায়িত্ব বর্তায় কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিত্ রায়ের ওপর। যথাসময়ে ছবিটি সেন্সর সনদ পায়। এবং প্রত্যাশামাফিক কলকাতার বাজারে বিপুল সাফল্যও লাভ করে। আয় করে ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় চার-পাঁচ লাখ টাকা।

ভারতে গিয়ে তখনো তেমন কিছু করে উঠতে পারেননি জহির রায়হান। সঙ্গে স্ত্রী সুচন্দা ও তাঁদের দু সন্তান—অপু ও তপু। সব মিলিয়ে বেশ ভালোই অর্থকষ্টে ছিলেন। আক্ষরিক অর্থেই কায়ক্লেশে দিন যাপন করছিলেন। ছবিটি থেকে যা আয় হয়েছিল তা দিয়ে পরিবার নিয়ে কলকাতায় বেশ গুছিয়ে উঠতে পারতেন।

কিন্তু জহির রায়হান হাঁটেন সম্পূর্ণ উলটো পথে। ‘জীবন থেকে নেয়া’র আয় থেকে একটা টাকাও রাখেননি নিজের জন্য।

পুরোটাই দিয়ে দেন মুক্তিযুদ্ধের ফান্ডে। তুলে দেন অস্থায়ী সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের ফিল্ম বিভাগের দায়িত্বে থাকা আবুল খায়েরের হাতে। অথচ তার পরদিনই আবুল খায়ের সাহেবের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয় জহির রায়হানকে। খাবার কেনার জন্য!

Development by: webnewsdesign.com