ব্রেকিং

x

নীল চাঁদরাতের অভিশাপ # মাধুরী দেবনাথ

রবিবার, ০৭ জুলাই ২০১৯ | ১:৪৮ অপরাহ্ণ | 568 বার

নীল চাঁদরাতের অভিশাপ # মাধুরী দেবনাথ

জন্মদিনের অনুষ্ঠান শেষ।দোতলা বাড়ির ছাদে আড্ডায় বসেছে পিয়াস,মুন আর রাহেল আংকেল।রাত হয়ে গেছে অনেকটা!তাই আর দূরের পথ পেরিয়ে বাড়ি ফিরলেন না আংকেল।তাঁকে অনেকটা জোর করেই রেখে দিল পিয়াস।জীবনের নানা বিচিত্র অভিজ্ঞতায় তাঁর গল্পের ভান্ডারও বেশ সমৃদ্ধ!

আংকেল বসে আছেন।কি যেন ভাবছেন…
হঠাৎ, ‘আংকেল খাওয়া দাওয়া হয়েছে তো ঠিক মত?’পিয়াস কি একটা হাতে নিয়ে আসছে।
হ্যাঁ,হ্যাঁ,খুব খেয়েছি।আজ দিনটাও পড়েছে ভালো।মুন মার জন্মদিনটা কিন্তু বেশ ইন্টারেস্টিং একটা দিনে!
একটা গল্পের গন্ধ পাচ্ছি মনে হচ্ছে….হেসে হেসে বলল পিয়াস।
হাহা….আরে গল্প তেমন কিছু না।আমারই গ্রামের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ল আরকি!সেই কবেকার কথা।
ওই যে মুনও এসে পড়ছে…দাঁড়ান,চা চানাচুরে গল্পটা জমবে দারুন!
“কী ব্যাপার…কী কী মিস করে ফেললাম আমি’ নাকু নাকু সুরে বলল মুন।
আরে বসো বসো,এক্ষুণি শুরু হবে!আংকেল বলছিলেন তোমার জন্মদিনটা বেশ একটা ইন্টারেস্টিং দিনে।
তাই নাকি!কেন কেন?
আংকেল শুরু করলেন,’ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় ২১বছর আগের…সদ্য চাকুরী পেয়েছি তখন।শহুরে জীবনে তখনো ঠিক খাপ খাইয়ে উঠতে পারিনি।ছুটিছাটা পেলেই গ্রামে চলে যাই।তো সেবারও কী এক ছুতোয় ছুটি নিয়ে চলে গেলাম বাড়ি।
রাস্তায় অনেক পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা কুশল বিনিময় চলল,কী খবর সুজনকা?খবরাখবর কী তোমাদের সবার?
এইতো চলতাছে বাজান।এইবার যে মেলা দিন পরে আসলা বাড়ি?
আর ছুটি কি চাইলেই পাওয়া যায় নতুন চাকরিতে।আসি কত ঝুটঝামেলা করে….
একটু রাস্তা পেরিয়ে কদমের সাথে দেখা,ভাইজান কত্তদিন পরে আইলেই আমনে!রেহানাবুরে ভূতে ধরছে!
কি?
হ ভূতে ধরছে।রাইতবিরাইতে ঘরের থেকে দেখা যায় মাইয়া নাই।
তাই নাকি?তো ডাক্তার কবিরাজ দেখা হচ্ছে না?
হইতাছে আরকি যা হয়।আমি আসি অহন।আমনের চাচিরে মোর সালাম দিয়া দিয়েন।
চাচাতো ভাই আমায় দেখি একটা চিৎকার দিল,’মা আ ভাইয়ে আইছে!
গ্রাম এখনো সেই আগের মতোই।বাইরের পৃথিবী কোথায় চলে গেছে কে কাকে বোঝাবে?
ভাবছি এসব হঠাৎ পেছন থেকে চাচাতো ভাই এসে ধরছে আর কাইলকা বিলে যামু মাছ ধরতে..হাটে যামু নয়া…নিয়া যাবা আমারে।
আচ্ছা নিয়া যাব।
চাচী ওরে ধমক দিলেন ছেলেটা খাইতে বসছে এখন খাইতে দে তো ওরে। আকাইম্মা ডা!
কালকে কি হইছে শুনছিস?
কী অইল চাচী কাল আবার?
রেহানা মাইয়াডার কী হইছে কেউ কিছু বুঝতাছে না।কালকে রাইতেও মেয়েরে পাওয়া গেছে পুকুরপাড়ে অজ্ঞান।কিছু কয়ও না,কিছু মনেও করতে পারে না।
পরদিন রেহানাকে দেখতে আসলাম।
এসেই একতান্ত্রিকের সাথে কালাম চাচার কথোপকথন শুনতেছি,আপনার মাইয়ারে বাঁচানোর সাধ্যি আমার নাই।এই মাইয়া ঘরছাড়া হইবই।নীল চান্দের রাইতে মাইয়ার জন্ম।এরে বাঁচাইব কে?
এইগুলো কী কন আমনে?মাইয়ার বিয়ার সম্বন্ধ আইতাছে।এখন এইসব ছড়াইলে মাইয়ারে বিয়া দিমু কেমনে আল্লাগো…কেঁদে উঠলেন কালাম চাচা।
যাই হউক আমি তো আমার জবান দিয়া দিছি।
না না আমনে এমন বইলেন না।আমি মাওলানা সাবরে খবর দেই।বাড়িটা বান্ধাইলে যদি এইটা কাটে….
চাচা আসসালামু আলাইকুম।
ওয়ালাইকুম সালাম,ও রাহেল বাজান আইছ বাড়ি?দাঁড়াও একটু আমি কথাটা সাইরা লই…
আফনে যা ভালো বুঝেন করেন আমারে রাইখেন না এই ফ্যাসাদের ভিতরে।মাইয়ারে চখে চখে রাইখেন।নীল চান্দের রাইত।খুব খারাপ খুব খারাপ…আসি আমি আইজ। বলে তান্ত্রিক ব্যাটা চলে গেল।

বাজান বও তুমি।কী যে অবস্থার মাঝে আছি।এই রেহানার মা,ঘরে যাও কিছু দাও বাজানরে।
এই রেহানা ঘরে যা।
চাচা আমারে একটু ঘটনাটা বুঝাই কনতো।
ঘটনার শুরু তো তিন-চাইর মাস আগে থাইকা।একরাইতে রেহানার মা পানি খাইতে উইঠা দেখে রেহানা ঘরে নাই।রাইতের বেলা সুজাত,আক্কাস সবাইরে ঘুম থেইকা ডাইকা তুইলা বাইর হইলাম মাইয়ারে খুঁজতে।সারা রাইত খুঁজার পর রেহানারে পাওয়া গেল মাঠের কোনার বাগানে।চুপ কইরা বইসা আছে মাঠের মইধ্যে চান্দের দিকে তাকায়া।বাড়ি আনার পর কিছু কয় না,কিছু মুখে লয় না,মনে করতে পারে না কিছু।খালি চাইয়া থাকে।এমনে গেল কয় মাস।এরপরে আবার একই ঘটনা।কাইলকা নিয়া চাইরবার হইছে এই রকম।
তাহলে কেউ ঘরে পাহারা বসায় না কেন?
সে চেষ্টা করি নাই কইতেছ?কয় দিন পাহারা দিয়া রাখছি লাভ হয় নাই।আর ভূতপ্রেতের কথা শুনলে লোকে ভয় পায়।আর এই কথা পাঁচ কান হইলেও তো বিপদ।আমি যে কী করুম বাপ,কিছুই দিশা পাইতেছি না।কে পাহারা দিব এই মাইয়ারে?
আমায় সেই ভার দিয়া দেন চাচা!আমি দেখি কিছু একটা করতে পারি কি না?
সেইদিন রাতে বাড়ির পেছনের দেউড়ি।রেহানার ঘরের দরজা হুড়কো আটকানো।একটা টর্চ আর একবুক সাহস!এই পুঁজি করে পাহারায় দাঁড়ালাম সুপারি বাগানের আড়ালে থেকে।
রাত গভীর হয়।আজকে চাঁদকে একটু যেন বেশিই উজ্জ্বল লাগছে!
দরজা অনড়!
নিস্তব্ধতা ক্লান্তি নিয়ে আসে।রাত বাড়ছে….চোখটা একটু যেন লেগে আসল।
ক্রা আ আ ক্কা আ….
হাহ!ঘুমিয়ে গেছিলাম নাকি পাহারা দিতে দিতে!
ক্রা আ আ…
রেহানা!রেহানা….
দরজা খোলা!
হাতের টর্চটাও দেখি সময়মতো আর জ্বলতে চাচ্ছে না।
শ স স স :….
ঘুটঘুটে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে এগোচ্ছি।
কী একটা শন শন শব্দ আসছে ঝোপের আড়াল থেকে।ভয় কৌতুহল সব মিলিয়ে ঝোপের পাতা সরিয়ে উঁকি দিলাম।
যা দেখলাম….তা আমি কল্পনাতেও ভাবিনি।
খ্রাসসসস রেহানা কি যেন গপাগপ খাচ্ছে!
রেহানা!
তেড়ে আমার দিকে আসছে।
পালাতে হবে এখান থেকে!
পরদিন আমাকে সকালবেলা অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় একটা মাঠের পাশে।বাসায় নিয়ে আসার পরে দুদিন জ্বরে পড়ে থাকি।পরে জ্ঞান ফিরলে জানতে পারি রেহানাকে খুঁজে পাওয়া যায় নি।আশে পাশে গ্রামে তল্লাশি চলে আরও দিন কতক,তারপর সব থেমে আসে আস্তে আস্তে।ধকলটা সামলে নিয়ে ঢাকা চলে আসি আমি।বিষয়টার কোন ব্যাখ্যা অনেক দিন পাইনি।কেন ওই দিন রাতে ওভাবে চার হাত- পায়ে হাঁটছিল আমাকে তাড়া করেছিল কী এমন অনেক প্রশ্ন আমাকে তাড়া করে বেড়ায় বহুদিন।

অনেক বছর নানা বিষয়ে পড়াশোনার পর ইউরোপের মধ্যযুগের ইতিহাস পড়তে গিয়ে আমি এর একটা আভাস পাই।আর্মেনিয়ায় খ্রিষ্টধর্মের গোড়াপত্তনের আগে ইউরোপে বিভিন্ন প্যালিওথিলিক ধর্মের প্রচলন ছিল।এর থেকেই উৎপত্তি হয় এনিমিজম।তার একটা বিশেষ শাখা নজর কাড়ে আমার।এই বিশ্বাসের উপাসকেরা বিভিন্ন প্রাণীর আত্মিক শক্তিতে বিশ্বাস রাখে।নিজেদের মধ্যে তা ধারণ করার জন্য পালন করে থাকে বিশেষ কিছু রীতি।যার মধ্যে একটা থাকে চার হাতে-পায়ে ভর দিয়ে হাঁটা।এই বিশ্বাস চার্চ খুব ভালোভাবে মেনে নেয় নি।অসংখ্য বিশ্বাসীকে অত্যাচার করা হয়,পুড়িয়ে মারা হয়।ফলে আস্তে আস্তে এদের প্রচার বেশ কমে আসে এবং একসময় প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায় এরা।তবে অনেকের বিশ্বাস এরা একেবারে হারিয়ে যায়নি।এখনো তাদের বিশ্বাস পালন করে যাচ্ছে তারা।
এনিমিজমের একটা বিশেষ প্রথা ছিল চাঁদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে।এই দিনটাতে তারা এই তিথিতে জন্ম নেওয়া একজন মানুষ বের করে বলি দিত তাদের দেবতার উদ্দেশে।বলা হয়ে থাকে এই প্রথা পালনকারীরা চিরযৌবন লাভ করে।যখন তখন যেকোন প্রাণীর রুপ ধারণের ক্ষমতা রাখে।
তাই বলছিলাম আরকি তোমার জন্মদিনটা বেশ একটা ইন্টারেস্টিং দিনে!
কিন্তু নীল চাঁদের রাতে জন্মদিন-তাদেরকে নিয়ে বলি দেওয়া….চমকে উঠল মুন!
ওই যে..শব্দ! আসছে কেউ!
হাহাহা আংকেল সত্যি দারুন গল্প বলতে পারেন।এতক্ষণে আপনার গল্পের রহস্য বোঝলাম।আপনি এই বলে আসলে ভয় পাওয়াতে চাচ্ছিলেন মুনকে।বউটা আমার ভয়ে চুপসে গেছে আংকেল!হাহাহা দারুন!
আমরা নিচে যাচ্ছি আংকেল….
হ্যাঁ,হ্যাঁ তোমরা নামো,আমিও আসছি।
গল্পের একটা অংশ আমি বাকি রেখেছি।
সেই রাতের পর আমার ভেতরেও একটা পরিবর্তন আসে।এনিমিজম নিয়ে পড়াশোনা করি আমি।অনেকদিন পর আরেক এমন রাতে ওদের সাথে যোগ দেই।
আজ আবার সেই নীল চাঁদের রাত…..
আমার প্রথম শিকারের রাত।
আমি আজ শিকারি!বলি দিব আমার প্রথম শিকার!বেঁচে থাকব অনন্তকাল,আরেক নীলচাঁদ রাতের অপেক্ষায়!

লেখক: বি এস এস (সম্মান, এম এস এস(অর্থনীতি)
এমসি কলেজ,সিলেট।

Development by: webnewsdesign.com