ব্রেকিং

x

ভূমিকাহীন মিউচ্যুয়াল ফান্ড

সোমবার, ২৮ মে ২০১৮ | ১২:১২ পূর্বাহ্ণ | 803 বার

ভূমিকাহীন মিউচ্যুয়াল ফান্ড

তারল্য সংকট আর বিনিয়োগকারীদের চরম আস্থার সংকটে সাম্প্রতিক সময়ে টানা দর পতন হয়েছে দেশের শেয়ারবাজারে। এতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স কমেছে প্রায় সাড়ে চারশ পয়েন্ট। বাজারের ভয়াবহ এ দরপনের পেছনে যে কয়টি কারণ রয়েছে, এর মধ্যে মিউচ্যুয়াল ফান্ডও একটি বলে মনে করছেন শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, বাইরের দেশে মিউচ্যুয়াল ফান্ড শেয়ারবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যারা শেয়ারবাজার ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগ করতে পারেন না তারা সাধারণত মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু আমাদের দেশে মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রয়েছে এ ফান্ডের সংকট। অন্যদিকে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ মিউচ্যুয়াল ফান্ডই রয়েছে দুরবস্থার মধ্যে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত মিউচ্যুয়াল ফান্ড রয়েছে ৩৭টি। এর মধ্যে ৩১টির ইউনিটের বাজার মূল্য অবিহিত মূল্যের নিচে। যে ছয়টি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মূল্য অবিহিত মূল্যের ওপরে রয়েছে, তার মধ্যে একটির দাম ১৬ টাকার ওপরে। বাকি পাঁচটির দাম ১৪ টাকা বা তারও নিচে।

এদিকে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমানে শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নির্ভরতা। এ বিষয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেন বলেন, বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এখনও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নির্ভর। যা বাজারের মূল সমস্যা।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নির্ভরতা এবং মিউচ্যুয়াল ফান্ডের কার্যকার ভূমিকা রাখতে না পারা বাজারের টানা পতনের একটি কারণ হতে পারে। তবে আমি মনে করি, এ সমস্যার সমাধানের জন্য বাজারে ভালো ভালো শেয়ার আনতে হবে।’

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. বখতিয়ার হাসান বলেন, ‘বাইরের উন্নত শেয়ারবাজারে দেখা যায় মিউচ্যুয়াল ফান্ড খুব ভালো রিটার্ন দেয়। বাজারের রিটার্ন থেকে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের রিটার্ন অনেক বেশি। কিন্তু বাংলাদেশে দেখা যায় মার্কেটের রিটার্নের থেকেও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের রিটার্ন কম। ফলে বিনিয়োগকারীরা মিউচ্যুয়াল ফান্ডে আগ্রহ দেখায় না। আবার মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মূল কাজ বিনিয়োগ করা হলেও, এখানে ফান্ডগুলো ট্রেডিং নির্ভর।’

তিনি বলেন, ‘মিউচ্যুয়াল ফান্ডের এ দুরবস্থার কারণ হলো ফান্ড ম্যানেজাররা চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দেন। তাদের দক্ষতার অভাব রয়েছে, রয়েছে প্রফেশনাল লোকেরও অভাব। অথচ মিউচ্যুয়াল ফান্ড কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারলে বাজারের এমন পতন হতো না। বাইরের দেশে দেখা যায় বাজারের ৩০-৪০ শতাংশই মিউচ্যুয়াল ফান্ড। সুতরাং এ মিউচ্যুয়ার ফান্ড বিক্রির চাপ না বাড়ালে বাজারে সেল (বিক্রি) প্রেসার কম থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে মিউচ্যুয়াল ফান্ড লভ্যাংশ হিসাবে বোনাস শেয়ার দেয়। কিন্তু বাইরের দেশে মিউচ্যুয়াল ফান্ড বোনাস বা স্টক লভ্যাংশ হিসাবে দেয় না। একমাত্র বাংলাদেশেই মিউচ্যুয়াল ফান্ড লভ্যাংশ হিসাবে স্টক দেয়। এটি সম্পূর্ণ মিনিংলেস (অর্থহীন)। মিউচ্যুয়াল ফান্ডের স্টক দেয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।’

ডিএসইর সাবেক পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, ‘আমাদের বাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলো খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কম। মিউচ্যুয়াল ফান্ড যাতে বাজারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেজন্য উদ্যোগ নিতে হবে। বোনাস দেয়ার পথ বন্ধ করতে হবে।’

ডিএসইর সাবেক পরিচালক খুজিস্তা নূর-ই-নাহরিন বলেন, ‘আমাদের দেশে মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলো তাদের পক্ষে নিয়ম-কানুন করেছে। বাইরের দেশে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের সম্পূর্ণ অংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। কিন্তু আমাদের দেশে এর একটি মাত্র অংশ বিনিয়োগ করতে পারে। এ কারণে মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলো এখানে ওইভাবে সাপোর্ট দিচ্ছে না।’

কী কারণে শেয়ারবাজারে টানা দরপতন হয়েছে- বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সাইফুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি খুঁজে বের করতে আমরা টিম গঠন করে আলোচনা করছি। সেখান থেকে বেশকিছু সাজেশন পেয়েছি। এগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় আমরা তা দেখছি।’

ব্যাংক খাতের দুরবস্থা, আইসিবির নিষ্ক্রিয়তার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যাংক নির্ভরতা কমিয়ে প্রভিডেন্ট ফান্ড বা পেনশন ফান্ডের মতো বিকল্প ফান্ডের বিষয়ে আমরা সাজেশন পেয়েছি। আইসিবি হয় তো সেভাবে সাপোর্ট দিতে পারছে না- এমন তথ্যও উঠে এসেছে। তবে আমরা বিনিয়োগকারীদের বলব, পেনিক না হওয়ার জন্য। আমরা সার্বিক বিষয়ে পর্যালোচনা করে দেখছি।’

মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বিষয়ে তিনি বলন, ‘মিউচ্যুয়াল ফান্ড সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করেছি। তারা কিছু মতামত দিয়েছেন। আমরা দেখছি সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। রেগুলেটরি কোনো সুবিধা দেয়ার মতো থাকলে আমরা চেষ্টা করব।’

অর্থকাল/এসএ/খান

 

Development by: webnewsdesign.com