ব্রেকিং

x

শ্রমজীবী মানুষ

মধ্যবিত্তের বিপুল কেনাকাটা বিপদে ফেলবে নিম্নবিত্তকে

মঙ্গলবার, ০৬ এপ্রিল ২০২১ | ৪:৪১ অপরাহ্ণ | 8 বার

মধ্যবিত্তের বিপুল কেনাকাটা বিপদে ফেলবে নিম্নবিত্তকে
সংগৃহীত ছবি

রাজধানীর মধুবাগ ঝিলপাড় এলাকায় সাইকেলের গ্যারেজ চালান মো. আলম। গতকাল সোমবার দুপুরে বন্ধ গ্যারেজের সামনে দেখা গেল, চোখেমুখে শঙ্কা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। বললেন, ‘গত বছর লকডাউনের (সাধারণ ছুটি) পর দোকান আবার চালু করলাম। ব্যবসা জমতে না জমতেই শুরু হলো রাস্তা কাটা(ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কারে সেই এলাকায় অনেক দিন রাস্তা বন্ধ ছিল)। আবার রাস্তা কেবল ঠিক হলো, এর মধ্যেই আবার লকডাউন।’

webnewsdesign.com

গত বছর সাধারণ ছুটির সময় বাড়ি চলে গিয়েছিলেন মো. আলম। যে কারণে দোকান প্রায় তিন মাস বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তখন বাড়িওয়ালা তিন মাসের মধ্যে এক মাসের ভাড়া মওকুফ করেছিলেন, বাকি দুই মাসের ভাড়া দিতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

এবার সরকার অবশ্য প্রজ্ঞাপনে শেষমেশ ‘লকডাউন’ বা ‘সাধারণ ছুটি’—এমন শব্দ ব্যবহার করেনি। বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সার্বিক কার্যাবলি/চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু যেই লাউ সেই কদু। কারণ, প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আগামী সাত দিন সব ধরনের গণপরিবহন (সড়ক, রেল, নৌ, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট) বন্ধ থাকবে। উৎপাদন ও সেবায় নিয়োজিত গণপরিবহনের ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। বিদেশি ও বিদেশফেরত যাত্রীদের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য হবে না।

এ ছাড়া সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস ও আদালত শুধু জরুরি কাজ করবে। অর্ধেক জনবল দিয়ে কাজ চালাতে হবে তাদের। বন্ধ থাকবে শপিং মল ও দোকানপাট। শিল্পকারখানা ও নির্মাণকাজ চলবে। শিল্পকারখানার শ্রমিকদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আনা-নেওয়া করতে হবে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর শ্রমিকদের জন্য ফিল্ড হাসপাতাল করতে হবে।

মোদ্দা কথা হলো, শ্রমশক্তির যে ৮৫ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, তাঁরা আবারও দুরবস্থার মধ্যে পড়তে যাচ্ছেন। গত বছর দীর্ঘ সাধারণ ছুটির সময় দুবেলা দুমুঠো খাবারের সন্ধানে ঢাকা মহানগরে খেটে খাওয়া মানুষের কান্নাকাটি, ছোটাছুটি শুরু হয়ে গিয়েছিল। এবারও বিধিনিষেধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। অথচ এবার বিধিনিষেধ আরোপের সময় গত বছরের শিক্ষা তেমন একটা কাজে লাগানো হয়নি বলে অনেকেই মনে করেন।

এদিকে রাজধানীর আরেকটি চিত্র হলো, বিভিন্ন সুপারশপ ও মুদিদোকানগুলোতে এখন মধ্যবিত্তের উপচে পড়া ভিড়, যাকে বলে প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কে কেনাকাটা। বাজারে নিত্যপণ্যের ঘাটতি আছে বা বিধিনিষেধের সময় নিত্যপণ্য পেতে সমস্যা হবে, এমন খবর না থাকলেও মধ্যবিত্তদের এভাবে বাজারে হামলে পড়ার মানসিকতা বিস্ময়ের জন্ম দেয়। তাঁদের কারণে ইতিমধ্যে পণ্যমূল্য বাড়তে শুরু করেছে। গত মাসে এমনিতেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়তি ছিল। চলতি মাসে তা আরেক দফা বাড়বে। এ অবস্থায় খেটে খাওয়া মানুষেরা যে আবারও ভোগান্তিতে পড়বে। বিপদটা ঠিক এখানেই।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ গত ৩ এপ্রিল এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘বলা হয়, কিছু ব্যবসায়ী রমজান এলেই “অহেতুক” দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেন। যদি দ্রব্যমূল্য অহেতুক বাড়ানোই যেত, তাহলে অন্যান্য সময় কি তাঁরা ক্রেতাদের প্রতি দয়া করে দাম বাড়ান না? তাহলে তো তাঁদের বরং প্রশংসাই করতে হয়। বাজারে চাহিদারও একটি বিষয় আছে। বলা যেতে পারে ব্যবসায়ীরা চাহিদার সুযোগ কখনো কখনো অন্যায্যভাবেও নেওয়ার চেষ্টা করেন।

কিন্তু বিত্তবান মানুষদের ক্রয়ক্ষমতা আছে বলেই তাঁরা দামের দিকে না তাকিয়ে যত খুশি কিনবেন, এটাও তো খুব সংযমের পরিচয় দেওয়া হলো না। তাঁরা কেনাকাটায় সংযমী হলে তো ব্যবসায়ীদের দাম বাড়ানোর সুযোগ কমে যায় এবং সীমিত সরবরাহের বিপরীতে বেশি চাহিদার খাদ্যপণ্যগুলো প্রকারান্তরে সবাই মিলে ভাগ করে নিতে পারেন। তাহলে কেবল ব্যবসায়ীদের সহনশীলতা ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে ও শাস্তির ভয় দেখিয়ে কি খুব লাভ হবে?’

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরও লেখেন, ‘এ ক্ষেত্রে অর্থনীতিশাস্ত্রের জনক অ্যাডাম স্মিথের বিখ্যাত একটি উক্তিও মনে রাখা দরকার, ক্রেতাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার উদ্দেশ্য ছাড়া ব্যবসায়ীরা কখনো একত্র হন না। সম্ভবত মন্ত্রী মহোদয় শুধু এই উক্তিটিই মাথায় রেখেছেন (৩ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, একশ্রেণির ব্যবসায়ী রোজা এলেই দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেয়, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।) তবে বাজার অর্থনীতিকে আরও মানবিক করতে সবারই কিছু দায়িত্ব আছে।’

* গত বছর দীর্ঘ সাধারণ ছুটির সময় ঢাকা মহানগরে খেটে খাওয়া মানুষের খাবারের সন্ধানে ত্রস্ত ছোটাছুটি শুরু হয়েছিল। * ভারতে যেমন আধার কার্ড আছে, তেমনি বাংলাদেশেও দরকার, যেখানে দরিদ্র মানুষের তথ্য থাকবে। * মধ্যবিত্তরা আতঙ্কে কেনাকাটা বেশি করায় পণ্যমূল্য বাড়ছে। এতে ভোগান্তি বাড়বে নিম্নবিত্ত শ্রেণির।
এক বছরের অভিজ্ঞতা

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে মানুষের চলাচল সীমিত করার বিকল্প নেই। কিন্তু শহরের দোকান ও হোটেলের কর্মচারী, মিস্ত্রি, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ভ্রাম্যমাণ সবজি ও ফল বিক্রেতা—এই শ্রেণির মানুষ ঘর থেকে না বেরোলে খাবেন কী? এ ছাড়া অর্থনৈতিক তৎপরতা স্তিমিত হলে সামগ্রিক চাহিদাও কমে। বিধিনিষেধ ওঠার পরও তার প্রভাব থেকে যায়, গত বছরের অভিজ্ঞতায় আমরা তা–ই দেখেছি।

বাস্তবতা হলো, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। গত বছরও সাধারণ ছুটির সময়ও এই শ্রমিকেরাই বেশি সংকটে পড়েছিলেন। তখন তাঁদের নানাভাবে ত্রাণ দিয়ে সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করে। কিন্তু সেই ত্রাণ বিতরণেও নানা অনিয়মের খবর বেরিয়েছে। অবশ্য দেশে গরিব ও অরক্ষিত মানুষের তালিকা থাকলে সরকারের পক্ষে সহজেই এমন সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব। ভারতে যেমন আধার কার্ড আছে, তেমনি বাংলাদেশেও ডিজিটাল আইডেন্টিফিকেশন জরুরি, যেখানে এই মানুষদের সব তথ্য থাকবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, কয়েক বছর ধরে চেষ্টার পরও এই তালিকা করে ওঠা সম্ভব হয়নি।

Development by: webnewsdesign.com