ব্রেকিং

x

মারইয়াম মনিকা’র গুচ্ছ কবিতা

বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২০ | ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ |

মারইয়াম মনিকা’র গুচ্ছ কবিতা

*অপেক্ষা*

উঁচু সিঁড়িগুলো ভাঙতে ভাঙতে ডুবে যাচ্ছে সাগরে
বুকের ভেতর ফেঁপে ওঠা সমস্ত ব্যথা সময়ের সূতোয় আটকে যায়;
সুখের জানালায় ঝুলে থাকে যে চুমুগুলো- সময় ফুরালে তা হেসে ওঠে
স্বপ্নের শিয়রে বসে এঁকে যায় শতাব্দীর পদচিহ্ন।

অন্তহীন নীলিমা পেরিয়ে মৃত্যু-ঘ্রাণে ভরে যায় রজনীগন্ধার বাগান
গণিকালয়ের উঁচু দেয়ালের ভেতর
ছটফট করতে থাকে নিষ্পাপ কিশোরীর সতীআত্মা।

পারিজাত ফুলের সুবাসে গলে যায় পাথরের দরজা
লাশকাটা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে আঁধারের মতো দীর্ঘশ্বাস;
বুকের গহীনের ধু-ধু তেপান্তরের উচ্চারিত হতে থাকে-
আর কতো ক্ষয় আর কতো ব্যথা আর কতো দুঃশাসন!

শরীরের নিবিড় ছায়ায় ভেসে ওঠে গাঢ় অন্ধকারের সমুদ্র
শুধু অপেক্ষা অপেক্ষা; যুগ-যুগান্তরের অপেক্ষা; কাল- মহাকালের অপেক্ষা
নক্ষত্র ঝরার অপেক্ষা ফুল ফোটার অপেক্ষা প্রেমের অপেক্ষা
জারুল গাছে সমস্বরে দুটি হলদে টিয়ে ডাকার অপেক্ষা!

একদিন কাঙ্ক্ষার কস্তুরীর সুগন্ধিতে ভরে উঠবে এ পৃথিবী – সেই অপেক্ষা।

*রক্তগঙ্গা*

এখন আর দুচোখের গণ্ডি পেড়িয়ে চুপিসারে অশ্রু ঝরে না
দীপ্ত চাহনিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে না
আনন্দ, উচ্ছলতা, প্রাণের ভালোবাসা
এ চোখে আজ শুধু রক্ত ঝরে
নিঃশ্বাসে প্রবাহিত হয় আগুনের ফুলকি
রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ থেকে মোঠোপথ অব্দি।

কেবল আকস্মিক ভয় এসে দুচোখ বুজিয়ে রাখে
এই না বুঝি রক্তগঙ্গা বয়ে গেলো
রক্তের স্রোতে বুঝি ভেসে গেলো
আমার বাংলা- আমার স্বাধীনতা।

আমার পবিত্র মাটি রক্তে ভিজে ভিজে
গলা অব্দি কাদাজলে ডুবে যাছে
লাশের গন্ধে আমার বাংলা মা-
শাড়ির আঁচলে মুখ লুকায় বারংবার,
তাঁর সন্তানহারা কান্নায় সমুদ্রে গর্জন উঠে
আকাশ ফেঁটে তর্জনে বর্ষণে আসে বিদ্যুৎ-
দিগন্তকাঁপা ঘূর্ণিঝড়
সেই ঝড়ে ছিন্নভিন্ন আমার বাংলা মায়ের অন্ন- বস্র
আর মাথার একগোছা রেশমি কালো চুল।

দিশেহারা উদভ্রান্তের মতো আমি এদিক সেদিক ঘুরে ফিরে
তোমার বুকে মাথা রাখলেই শুনতে পাই-
অগ্নিদগ্ধ মানুষের করুণ আর্তনাদ
বুলেটে বিদ্ধ মানুষের চাপা শ্বাস।

কেবলি মাথা ঠুকরে ঠুকরে লুটিয়ে পড়ি বিভৎস অভিশাপে
ধর্ষিতার চিৎকারে আমার কান অসাড় হয়ে যায়
তাদের জরায়ু ছেঁড়া রক্তে রক্তাক্ত হয়-
শুভ্র শিউলি, বেলী, হাসনাহেনা।

আজ ফেরারি পাখির মতো ফাঁকি দিয়ে
উড়ে গেছে দেশপ্রেম মানবপ্রেম
উপাসনা শুধু ক্ষমতার অর্থের বিত্তের
মার-মার, কাট-কাট, ধর-ধর
সর্বত্র বাজে শুধু যুদ্ধ যুদ্ধ দামামা।

যদি প্রশ্ন করি, কার জন্য এতো আয়োজন?
কার রক্তে রাঙাও আকাশ ছোঁয়া ভবনের চুন মাখানো সাদাদেয়াল?
কার পায়ে পূজো দেবে? এতো সুখ!
তোমার দেবী, তোমার ঈশ্বর, তোমার সৃষ্টিকর্তা
নেবে কি এ অভিশপ্ত পূজো?
তবে আর কেন?

*নারী মুক্তির কথা*

নারী মুক্তির গান আমরা সবাই গাই
তবুও কি মুক্তি পেয়েছে নারী?
মুক্তি মেলেছে কি নারীর স্বাধীন চিন্তার?
সে-কি শাখা প্রশাখা প্রসারিত করে আস্ত বটোবৃক্ষ হতে পেরেছে কখনো?
সে-কি সমস্ত ঝড় সাইক্লোন উপেক্ষা করে
মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে পাইন গাছের মতো?
না-কি তার শাখা- প্রশাখা- প্রকাণ্ড ছেটে ছেটে
হাতের নাগালে দমিয়ে বনসাই করে রাখা হয়েছে?

নারীর প্রতিটি পদক্ষেপ গুনে গুনে হিসাব করে ফেলতে হয়
কারণ তারা কখনো সেভজোনে থাকে না,
তারা ভালো করেই জেনে গেছে
তাদের চারপাশে হায়েনা, জানোয়ারেরা ওঁৎ পেতে থাকে।
ওদের কামকাতুর জিভ দিয়ে সর্বক্ষণ
কুকুরের মতো লালা ঝরতে থাকে,
প্রতিটি আঙুলের আঁচড়ে এমন ভাইরাস
যার এন্টিডট এখনো বাজারজাত হয়নি।

প্রতিদিন ফুলের মতো শতশত জীবন ঝরে যাচ্ছে
অঙ্কুরিত হয়ার আগেই থেমে যায় প্রস্ফুটিত হয়ার ক্ষমতা
আগেই বলেছি, নারীর কোন সেভজোন নেই।
থাকলে কি আর তিন বছরের শিশু
আর্তচিৎকার করে আকাশ বাতাস ভারী করে?
বাসে-ট্রামে, স্কুল- মাদ্রাসা, হসপিটাল,
তার বেডরুম পর্যন্ত আনসেভ
এমনকি আনসেভ তার মৃতদেহ- কবেরে ও মর্গে
সেই পুরুষই আবার নারী মুক্তির গান গায়-
বক্তৃতায় মঞ্চ কাঁপায়, রাজপথ বন্ধ করে
দাঙ্গামা, হরতাল, মিছিল, হাতে হাতে নারীর ফেস্টুন
তাতে লেখা, ‘নারীর অধিকার চাই’
‘নারী ধর্ষণের বিচার চাই’
‘নারীর মুক্তি’ ‘ নারীরা শক্তি’

*সাদা মেষ শাবকের দল*

পশ্চিম সমুদ্র গঙ্গায় ডোবে পৃথিবীর সমস্ত আলো
সন্ধ্যার নির্জনতা ছাড়িয়ে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে গতকালের রোমাঞ্চিত চুম্বন
অগণিত প্রহরের ক্রন্দনে তৈরি হয় লাল কাঁকড়ের পথ
অলস স্বপ্নের মতো গাঢ় হতে থাকে চাঁদের আলো।

রাতের তামাশায় যখন নাচতে থাকে সাদা মেষ শাবকের দল
আদিগন্ত ফসলের মাঠে চাষ হয় ধোঁয়াটে বিশ্বাস
অবসন্ন মানুষের চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ে ধূসর শহর
জমাট বাঁধা বরফের মতো জমে তথাকথিত সংসার।

এ্যাসেমব্লির মতো লম্বা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে সুখ দুঃখ
মাথার মগজ বেয়ে বেড়িয়ে আসে বিরহের সুর
ছায়াহীন মাঠের প্রান্তরে কোলাহল করে অসমাপ্ত সঙ্গম
বে-পড়োয়া প্রেমের দিব্বি দিয়ে রক্তাক্ত হয় কিশোরী।

জমকানো মসজিদ মন্দিরের ভেতর ভর করে আছে গাঢ় শূন্যতা
ফাঁকা আকাশের বুকে উড়ে যায় পাখির নীল কান্না
আমাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে জীবন তুড়ি মাড়ে
সাদা মেষ শাবকের দল গুমোট কুয়াশার মতো ছড়াতে থাকে ভূতুরে ছাঁয়া।

Development by: webnewsdesign.com