ব্রেকিং

x

মৃন্ময়ী # মাধুরী দেবনাথ

সোমবার, ১৩ মে ২০১৯ | ১২:০২ অপরাহ্ণ | 613 বার

মৃন্ময়ী # মাধুরী দেবনাথ

মৃন্ময়ী ও অপূর্ব ভালো বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষের গন্ডি পেরিয়ে আজ ওরা ৩য় বর্ষে পা রেখেছে। মৃন্ময়ী অপূর্বকে মনে মনে খুব পছন্দ করে। ভালোলাগা যে কখন ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে তা টের ই পায় নি। অপূর্ব ও তার চাল-চলনে সেটাই বুঝাতে চায় মৃন্ময়ীকে তার ভীষন ভালো লাগে কিন্তু বলা হয়ে উঠে নি যদি মৃন্ময়ী না চায় তাহলে তাদের এই ভালো বন্ধুত্বটা হয়তো চিরদিনের জন্য হারাতে হয়।

একদিন অপূর্বই সাহস করে মৃন্ময়ীকে ভালোবাসার কথা বলে দেয়। মৃন্ময়ী ফেরাতে পারে নি সেইদিন অপূর্বকে কারন সেতো অনেক আগেই ভালোবেসে ফেলেছিল অপূর্বকে।
সময়ের সাথে সাথে ওদের ভালোবাসা বাড়তে থাকে। অপূর্ব চোখে হারায় মৃন্ময়ীকে।

নেহা অপূর্ব এর কলেজ জীবনের খুব ভালো বন্ধু ছিলো। একদিন ওর সাথে মৃন্ময়ীকে বন্ধু বলে পরিচয় করে দেয় অপূর্ব। সেদিন নেহার মুখটা ছিলো দেখার মতো। মৃন্ময়ী বুঝতে পেরেছিলো নেহা তাকে সহ্য করতে পারছিলো না।

মৃন্ময়ী অপূর্বকে নিজের জীবন থেকেও বেশি ভাবতে শুরু করছে। এখন শুধু স্বপ্ন অপূর্বকে ঘিরে। নিজের জন্য মৃন্ময়ীর ভাবনা হয় না।অপূর্বর একটা চাকুরী হলে মৃন্ময়ীকে একবারে কাছে টেনে নিবে সে। অপূর্ব বলেছে মৃন্ময়ীকে কিছু করতে হবে না। শুধু তাকে মন ভরে ভালোবাসতে হবে এটাই তার কাজ।

মৃন্ময়ী অপূর্ব কে কিছু দিতে পারলে খুব খুশি হয়। ওর সব খুশি যেন এখন অপূর্বর খুশিতে।
ভালোই চলছিল ওদের দিনগুলো। হঠাৎ মৃন্ময়ীর জীবনে আসলো এক ঝড় গ্রহন লেগে গেলো ওর ভালোবাসার সুখের দিনগুলোতে।
অপূর্ব কেমন জানি হয়ে গেছে। কি জানি চিন্তা করে দেখা করতে চায় না মৃন্ময়ীর সাথে,আগের মত প্রান খুলে কথা বলতে চায় না।
মৃন্ময়ী ভাবে হয়তো পরিবারের চাপ খুব বেড়েছে তাই হয়তো এমন করেছে।
একদিন রাস্তায় দেখা হয় নেহার সাথে। নেহাকে দেখে না দেখার ভান করলো মৃন্ময়ী ।নেহাই ডাকলো মৃন্ময়ীকে,কেমন আছো?
ভালো।আপনি?
আমিও ভালো। তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো মৃন্ময়ী। সময় হবে তোমার?
হ্যাঁ, চলেন কোথায় গিয়ে বসে কথা বলি।
ওরা একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসলো।
আচ্ছা তুমি করে বলছি অপূর্বর বন্ধু তো তুমি।আচ্ছা তুমি কি শুধুওই অপূর্বর বন্ধু? নাকি তার চেয়েও বেশি?
বন্ধু-ই তো। কেন?
দেখো মৃন্ময়ী ওইদিন তোমায় আমি অপূর্ব এর সাথে দেখে আমি খুব বিরক্ত হয়েছিলাম। আমি বুঝতে পেরেছিলাম তুমি অপূর্বকে ভালোবাসো।কিন্তু তুমি তো মরীচিকার পেছন ছুটছো। ওটাকে দেখা যায় কিন্তু ছোঁয়া যায় না।
তুমি অপূর্বকে কতটা চেনো?তুমি জানো ওর সাথে আমার কতবছর এর বন্ধুত্ব? তুমি এসে আমাদের বন্ধুত্ব কে নষ্ট করে দিয়েছো।
শুন তোমার ভালোর জন্য আজ কয়টি কথা বলছি।
ও আমার কলেজ জীবনের সব থেকে ভালো বন্ধু ছিলো । ও একটা মেয়েকে খুব ভালোবাসতো। ওর নাম মিরা, আমি জানতাম। কিন্তু মিরা খুব অহংকারী ছিলো। ও ভালোবাসেনি অপূর্বকে। আমি অনেক চেষ্টা করেছি ওর জন্য মিরার মন গলাতে পারি নি।অপূর্ব ও বারবার ওর কাছ থেকে ফিরে এসেছে। কিন্তু তুমি একটা জিনিস জানো কি না জানি না ছেলেরা একবার কাউকে পেতে চাইলে যতক্ষন না পর্যন্ত ওকে না পায় তার জন্য পাগল থাকে ওকে পাওয়ার জন্য মরিয়া থাকে। অপূর্ব ও ঠিক তেমনি ছিলো।
অপূর্বর অবস্থা তখন খুব খারাপ ছিলো। তখন ওর পাশে আমি ই দাঁড়িয়ে ছিলাম।
অপূর্ব আমার সাথে বেড়াতো,ঘুরতো।
আস্তে আস্তে অপূর্ব স্বাভাবিক হতে থাকে। কিন্তু মিরাকে ভুলতে পারে নি।
এর মধ্যে বন্ধু হয়ে তুমি ওর জীবনে এলে। ও ছিটকে যায় আমার কাছে থেকে। তোমাকে আড়াল করে রাখে আমার কাছে থেকে। আমাকে এড়িয়ে যেতে থাকে। আমি বুঝতে পেরেছিলাম ও ভালোই আছে এখন তাই ওর পাশ থেকে আমিও আস্তে আস্তে সরে গিয়েছিলাম।
তোমায় ওইদিন দেখে আমার খুব সরল লেগেছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম তুমি অপূর্বকে খুব ভালোবাসো। কিন্তু আমি তো অপূর্বকে জানি। ওতো আজও মিরাকে নিয়েই স্বপ্ন দেখে তোমাকে নিয়ে নয় মৃন্ময়ী।
মৃন্ময়ী বুঝতে পারে নি ওইদিন কি বলবে নেহাকে।
তাহলে এতদিন কি মিথ্যে ছিলো ওর ভালোবাসা?না তা হতে যাবে কেন?
তাহলে অপূর্ব ই বা এমন করে কেন?
মিলাতে পারে না মৃন্ময়ী ।
অপূর্বকে বলতে গিয়ে ও পারে না। অপূর্ব এখন ওর কোন কথার গুরুত্ব দেয় না।
মৃন্ময়ী খুব কষ্ট পায় যে মানুষটার জন্য সে জীবন দিতেও দ্বিধাবোধ করতো না ওই এখন এমন করে। অথচ এই অপূর্ব ই বলেছিলো কথা দিয়েছিলো জীবনের শেষ দিনগুলোতেও পাশে থাকবে তার ছায়া হয়ে। অদ্ভুত শূন্যতা বাসা বাঁধে মৃন্ময়ীর মনে। একাকীত্ব নিঃসঙ্গতা খাঁ খাঁ করে পুরো ভিতরটা জুড়ে। পুরোটা সত্তা দিয়ে তো সে ভালোবেসেছিলো মানুষটাকে। তার তো কোন কমতি ছিলো না ভালোবাসায়।

তাহলে কেন এমন হলো? এই প্রশ্নের উত্তরটা খুঁজে পায় না মৃন্ময়ী ।
অপূর্ব কাজের বাহানায় দূরে রাখে মৃণ্ময়ীকে।মৃণ্ময়ী বুঝে কিন্তু কিছু বলতে পারে না। ভয় পায় যদি অপূর্ব তার জীবন থেকে চলে যায় তাহলে কি নিয়ে বাঁচবে সে। যারা মুখ বুজে সব সহ্য করে উলটো তারাই আসামী হয়।
আবার মনকে শান্ত করে মৃন্ময়ী ভাবে হয়তো নেহা ভুল বলেছে তাকে। সব মিথ্যে। অতীত থাকুক তাতে কি সমস্যা? ওতো ভালোবাসছে অপূর্বকে জয় করে নিয়েছে ওকে। কিন্তু অপূর্ব কি সত্যি চায় তাকে?
একদিন অপূর্ব বলল তার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। পেটজুড়ে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে। ডাক্তার বলছে ওর কিডনীতে একটু সমস্যা হয়ছে।যদিও পুরোটা শুনে নি অপূর্ব।
ভীষন চিন্তায় পড়ে গেলো মৃন্ময়ী ।অতনুকে ফোন দিলে পুরো ব্যাপারটা জানা যাবে।অতনু অপূর্বের ছোট ভাই। মৃণ্ময়ী ফোন করলো অতনুকে। অতনু যা বললো তার জন্য প্রস্তুত ছিলো না মৃন্ময়ী । অপূর্বের ২টা কিডনীই নষ্ট হয়ে গেছে। ওকে বাঁচাতে এখন অনেক টাকা দরকার। আপাতত একটা কিডনী খুব বেশি দরকার ওকে বাঁচাতে। অপূর্ব ও মৃন্ময়ীর রক্তের গ্রুপ একই।
মৃন্ময়ী সিদ্ধান্ত নিলো তার একটি কিডনী দিয়ে বাঁচিয়ে রাখবে অপূর্বকে। মানুষ টাকে হারিয়ে যেতে দিবে না সে তার জীবন থেকে। তার জীবনের মূল্যে কিনে রাখতে চায় সে অপূর্বকে।পরিবারের সবাইকে ফাঁকি দিয়ে নিজের জীবনের মূল্যবান একটা টুকরা দিয়ে অপূর্বকে বাঁচিয়ে আনে মৃত্যুর মুখ থেকে। এখন অপূর্বের জীবনের উপর শুধু তার ই অধিকার।
অপূর্ব ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকে। মৃন্ময়ী ভাবে তাদের দূরত্ব টা এই বুঝি ঘুচলো। কিন্তু সত্যি কি তাই হলো..
কিছুদিন খুব ভালোই চললো…
অপূর্বর একটা চাকুরী হয়েছে। এখন বেশ টাকা পায় সে। কিন্তু মৃন্ময়ীর প্রতি সেই টান নেই। কেমন জানি আনমনা থাকে সে। কথা বললে উদাসীন হয়ে কথা বলে সে। অনেক কথায় উত্তর এড়িয়ে যায়।
মৃন্ময়ী জানতে পেরেছে মিরা এখন অপূর্বর ভালোবাসার ডাকে সাড়া দিয়ে ফিরে এসেছে অপূর্বের জীবনে। তাই অপূর্বের এখন মৃণ্ময়ীর প্রয়োজন নেই।
অপূর্ব হয়তো জানে না কিছু মিরাদের স্বার্থপরতার কারনে ভালোবাসা নষ্ট হয় আর কিছু মৃন্ময়ীদের আত্মত্যাগের কারনে ভালোবাসা মহান হয়।
যে মানুষটি ভালোবাসার মানুষের সব অতীত জেনেও এতটা ভালোবাসতে পারে ওকে জিতিয়ে দেবার জন্য অনেক ত্যাগ হাসিমুখে মেনে নেয় তার কাছে শুধু ভালোবাসাই না,পৃথিবীর কোন শক্তি ই জিততে পারে না।
এভাবে ই যুগ – যুগ ধরে অপূর্ব রা বেঁচে থাকুক মৃন্ময়ীদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়।
লেখক: বি,এস,এস (অনার্স), এম,এস,এস(অর্থনীতি)
এমসি কলেজ,সিলেট।

Development by: webnewsdesign.com