ব্রেকিং

x

রাজধানীতে কৃষকের বাজার

সোমবার, ২২ মার্চ ২০২১ | ১০:১৮ অপরাহ্ণ |

রাজধানীতে কৃষকের বাজার
সংগৃহীত ছবি

যে কৃষক জমিতে ফসল ফলান, তিনিই বিক্রেতা। তা–ও আবার খোদ রাজধানীতে ফসল বিক্রি করছেন কৃষকেরা। রাজধানীর আশপাশের এলাকা থেকে শুধু নয়, দূরের পার্বত্য চট্টগ্রামের জুমের ফসলও পাওয়া যায় বাজারে। দিন দিন ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে এখানে। খেত থেকে আনা টাটকা সবজি পেতে কে না চায়। উদ্যোক্তারা বলছেন, এখানে পাওয়া সবজি নিরাপদ।

জাতীয় সংসদ ভবনের উল্টো দিকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পাশ ঘেঁষে থাকা সেচ ভবন প্রাঙ্গণে বসে এ বাজার। সপ্তাহে শুক্র ও শনিবার দুই দিন সকাল সাতটার দিকে শুরু হয় বাজার, চলে দুপুর পর্যন্ত।

সেচ ভবনে ঢোকার মুখে রাস্তার দুই পাশজুড়ে ছোট ছোট দোকানে উৎপাদিত পণ্য নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। তাঁদেরই একজন মুন্সিগঞ্জের ইউসুফ। প্রচলিত সব সবজি আছে ইউসুফের কাছে। যেমন ফুলকপি, বাঁধাকপি, আলু, লাউ, বেগুন, বথুয়াশাক, লালশাক, মরিচ, পেঁপে, শিম ইত্যাদি। নিজের খেতের ফসল। ইউসুফ বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বিকেলে ফসল তুলি। শুক্রবার ভোরে উইঠ্যা রওনা হই। দুপুর পর্যন্ত বিক্রি কইর‍্যা বাড়ি ফিরি। বিক্রিবাট্টা আল্লাহর রহম মন্দ না।’

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন ও হরটেক্স ফাউন্ডেশন এ বাজার পরিচালনা করে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে বাজার চালু হয়। শুরুতে হাতে গোনা কৃষক আসতেন। এখন সেচ ভবনের পুরো প্রাঙ্গণ ভরে গেছে। প্রতিদিন নতুন ধরনের পণ্য আসছে বাজারে।

এই যে বলা হলো নতুন ধরনের পণ্য, এটা একটা বৈশিষ্ট্য এ বাজারের। দেশের প্রচলিত সবজির বাইরে বিদেশি, অপ্রচলিত নানা সবজিও পাওয়া যায় এখানে। সাভারের হেমায়েতপুরের আরিফ শুধু বিদেশি সবজি ও ফলের চাষ করেন। তাঁর দোকানে গিয়ে মিলল তিন ধরনের ক্যাপসিকাম, লেটুস, ব্রকলি, রেড ক্যাবেজ, বেবি কর্নসহ নানা সবজি।

আরিফ বলেন, ‘শুরুতে ভাবছিলাম এখানে এসব ফসল বিক্রি হবে কি না। এখন তো সাপ্লাই দিয়া সারতে পারি না। আমার সব পণ্যই হয় জৈব পদ্ধতিতে। এ পণ্য নিরাপদ।’

ঢাকার ভোক্তাদের কাছে নিরাপদ সবজি ও ফল পৌঁছানোই এ বাজারের মূল লক্ষ্য, এমনটাই জানান, হরটেক্স ফাউন্ডেশনের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) মিটুল কুমার সাহা। তিনি এ বাজারের তত্ত্বাবধানে আছেন শুরু থেকে। এ নিরাপদ ফসলের নিশ্চয়তা দেওয়া যায় কীভাবে? মিটুল সাহার কথা, ‘এখানে কৃষিপণ্য আনার জন্য কৃষকদের উপজেলা কৃষি অফিসারের প্রত্যয়ন নিয়ে আসতে হয়।

এখানে আনা সব ফসল একেবারে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকমুক্ত, তা নয়। তবে এসব ব্যবহার করা হলেও তা নিয়ন্ত্রিত থাকে। আর ফসল তোলার পর নির্দিষ্ট বিরতি দেওয়া হয়। এভাবেই নিরাপদ সবজির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়।’

শুরুতে ৮ থেকে ১০ জন কৃষকের দোকান দিয়ে বাজার শুরু। এখন ২৫ থেকে ৩০ জন আসেন। সাধারণ সবজি, অপ্রচলিত সবজি থেকে শুরু করে এখানে এখন নানা জাতের ফলেরও সমারোহ চোখে পড়ে। কলা, পেঁপে, তরমুজের বাইরে আছে হানি ডিউ, রক মেলন (শাম্মাম), রেড ও ইয়েলো তরমুজ ও স্ট্রবেরি। এ বাজারে নারী বিক্রেতাও আছেন কয়েকজন। তাঁরা উদ্যোক্তা হিসেবেও সুনাম কুড়িয়েছেন। তাঁদের একজন রাজিয়া সুলতানা। তিনি রাইয়ান অ্যাগ্রোলিংক নামের একটি কৃষি বিপণন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। রাজিয়া সুলতানা বলছিলেন, ‘এ বাজার আমাদের জন্য একটি বড় জানালা খুলে দিয়েছে।’

এ বাজারে শুধু ঢাকার আশপাশের নয়, সেই পার্বত্য জেলা রাঙামাটির লংগদু থেকে জুমের (পাহাড়ের প্রচলিত চাষ পদ্ধতি) ফসল নিয়ে আসেন দুই চাকমা যুবক। জুমের বিন্নি চাল, মরিচ, মারফা (বড় শসা), পাহাড়ি সূর্যমুখী কলাসহ নানান পণ্যের পসরা নিয়ে বসেন তাঁরা।

বিচিত্র ফসলের এ বাজারের প্রসার যে দিন দিন বাড়ছে, তা বোঝা গেল ধানমন্ডির বাসিন্দা প্রকৌশলী জুলফিকার আলীর কথায়। বললেন, ‘এ বাজারে শুরু থেকেই আসি। এখন প্রচুর ভিড়। এখানকার সবজি নিরাপদ বলেই মনে হয়। আর এখানে দামটা কিন্তু মোটেও বেশি না।’

অর্গানিক বা নিরাপদ বলে তকমা লাগিয়ে বেশি দামে বিক্রির প্রবণতা এ বাজারের কৃষকদের নেই, তা স্বীকার করলেন বনানী থেকে আসা ক্রেতা ফয়সাল হোসেন। তিনি জানান, একেবারে গাড়ি ভর্তি করে সপ্তাহের বাজার সারেন এখানে।

সবজি-ফল ছাড়াও বাজারে পাওয়া যায় ঘরে বানানো হরেক রকমের আচার। মৎস্য অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ মাছের দোকান এ বাজারে নতুন সংযোজন।

Development by: webnewsdesign.com