ব্রেকিং

x

হেলেন কেলার # মাধুরী দেবনাথ

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯ | ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ | 502 বার

হেলেন কেলার # মাধুরী দেবনাথ

এক কিংবদন্তী নারীর অনন্য গল্প….

‘অন্ধত্ব নয়,অজ্ঞতা ও অনুভূতিহীনতাই দুনিয়ার একমাত্র দুর্ভেদ্য অন্ধকার’। জীবন যার ভাষাহীন,প্রকৃতির রুপ-রস-গন্ধ থেকে যিনি বঞ্চিত,এককথায় শ্রবনহীন জীবন-এ ধরনের মানুষকে বিধাতার চরম অভিশাপ হিসেবেই মনে করেন অনেকে। কিন্তু এমনও একজন ছিলেন যিনি তা কখনোই বিশ্বাস করতেন না। এরকম অসহায়ত্বকে জয় করে পৃথিবীর ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন যে ব্যক্তি,তিনি আর কেউ নন,মানবতার পূজারী মহিয়সী হেলেন কেলার। প্রচণ্ড ইচ্ছে শক্তি মানুষকে যে কোথায় নিয়ে যেতে পারে,তার জ্বলন্ত উদাহরণ এই নারী।শারীরিক সব অক্ষমতাকে প্রচণ্ড মানসিকশক্তি দিয়ে জয় করে হেলেন হয়ে উঠেছিলেন একজন চিন্তাশীল -সৃষ্টিশীল মানুষ।সেই নারীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা রেখে আমার আজকের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস তাঁরই চরণে।
১৮৮০সালের ২৭জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এলবামা তাসকাম্বিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হেলেন।পিতা আর্থার কেলার ছিলেন সামরিক বিভাগের একজন অফিসার।মা কেইট এডামসের ভালোবাসা ও আদরে বেড়ে ওঠা হেলেন শৈশবে ছিলেন ভীষণ চঞ্চল প্রকৃতির।কিন্তু তার এই চঞ্চলতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।এক বছর সাত মাস বয়সে এক দূর্ঘটনা ঘটে তাঁর জীবনে।স্নান করানোর সময় মায়ের কোল থেকে হঠাৎ পড়ে যান শিশু হেলেন।সেই আঘাতে সাময়িক জ্ঞান হারানোর পর তা ফিরে এলেও তাঁর মা লক্ষ্য করলেন তার আদরের সন্তান দৃষ্টি ও শ্রবণ শক্তি একেবারেই লোপ পেয়েছে।নিরুপায় পিতামাতা তখন শরণাপন্ন হলেন ডাক্তারের নিকট।
ডাক্তার অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানালেন তার এই শারীরিক বিপর্যয়ের কারণ হলো মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর আঘাত।আর এভাবে চিরদিনের জন্য শিশু হেলেনের জীবন থেকে হারিয়ে যায় তার কথা বলা,শোনা ও দেখার শক্তি।এর কিছুদিন পর আর্থারের সাথে দেখা হয় সে সময়ের ডাক্তার আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের।ইনিই হলেন যোগাযোগ প্রযুক্তির অগ্রদূত টেলিফোনের আবিষ্কারক।আর্থার পরামর্শ গ্রহণের জন্য তার কন্যা হেলেন কে নিয়ে যান বেলের কাছে। প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বেল জানালেন হেলেন আর কোনদিন চোখে দেখতে এবং কানে শুনতে পারবেন না।তবে গ্রাহাম বেল হেলেনের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা দেখে আর্থারকে হেলেনের জন্য যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করতে বলেন যাতে স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি একটা সুন্দর জীবন ফিরে পেতে পারেন হেলেন।বেল বোস্টনের পাকিনস ইনস্টিটিউশনে হেলেনকে ভর্তি করে দেওয়ার জন্য বলেন।এই প্রতিষ্ঠানটির কাজ ছিলো অন্ধদের শিক্ষা দান।এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ডাক্তার হো।হেলেনের শিক্ষাগ্রহনের ভার তিনি নিজ হাতে তুলে নিলেন।তিনি হেলেনকে স্নেহ দিয়ে লেখাপড়া শেখাতে শুরু করেন।কিন্তু অকস্মাৎ ডাক্তার হো মারা গেলে হেলেনের সমস্ত দায়িত্ব নেন এনি সুলিভ্যান ম্যানসফিল্ড নামের শিক্ষয়িত্রী। হেলেনের জীবনকে আলোকিত করার দায়িত্ব নিলেন তিনি।এনিও ছোটবেলা থেকে চোখে কম দেখতেন।পরপর দুবার অপারেশন হয়।তারপর স্বাভাবিক দৃষ্টি ফিরে পান।অন্ধকার জীবনের যন্ত্রণা অনুভব থেকেই তিনি অন্ধদের জন্য কাজ করার সংকল্প নেন।

এনি অন্ধ এই শিশুকে স্পর্শের মাধ্যমে জগত চেনাতে লাগলেন।আলোর ছোঁয়া ও অন্ধকারের অনুভূতির তফাৎ বোঝালেন।আস্তে আস্তে হেলেন অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সব শিখে নিতে থাকেন।লুই ব্রেইল আবিষ্কৃত ব্রেইল পদ্ধতির মাধ্যমে হেলেন লেখাপড়া শিখতে শুরু করেন।হেলেন এগারো বছর বয়সে এক বিশেষ পদ্ধতির ব্যবহার করে কথা বলার চর্চা করতে থাকেন।
ধীরে ধীরে চিকিৎসার মাধ্যমে তার বাকশক্তি অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে থাকে।বিশ বছর বয়সে হেলেন সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম,ইতিহাসে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।ভর্তি হন র‍্যাডক্লিফ কলেজে।
কলেজে পড়াকালীন তিনি লিখেন তার প্রথম আত্মজীবনীমূলক রচনা’Otimism’ ৪বছর পর তিনি সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে বি.এ পাস করেন।কলেজে স্নাতক হবার পর তিনি লিখেন তাঁর আত্মজীবনীমূলক ২য় রচনা’The story of my life’ যেখানে তিনি তাঁর জীবনের বিপর্যয়, লড়াই,এনির কাছ থেকে শিক্ষা লাভ,তার প্রতি শ্রদ্ধা,ভালোবাসার জীবনচিত্র তুলে ধরেন তাঁর অপূর্ব লেখনীতে।তাঁর এই রচনার মধ্য দিয়ে তিনি ব্যাপক খ্যাতিও অর্জন করেন।লোকের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে থাকে তাঁর নাম।
জীবনের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হেলেন সাংবাদিক পেশায় কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্ররোচনায় এনি ও হেলেনের লেখার নামে বিভিন্ন সমালোচনা ও কুৎসা রটতে থাকে।
সে ঘটনার পর ঠিক করলেন সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে দিবেন।এনি ও হেলেন বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট মঞ্চে বক্তৃতার আয়োজন করতেন।দলে দলে লোক ভীড় করতে থাকে সেসব অনুষ্ঠানে।তাঁর বক্তৃতার সূক্ষ্মতা ও চিন্তার গভীরতা দেখে মুগ্ধ হন শ্রোতারা।কিছুদিনের মধ্যেই হেলেনের অসংখ্য অনুরাগী ভক্ত তৈরি হলো।দিন দিন তাঁর ভক্তের সংখ্যা বাড়তে লাগলো।প্রচণ্ড রাজনীতি সচেতন ছিলেন তিনি।নোংরা রাজনীতির বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার ছিলেন।নারীদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই সময়ে আরেক নতুন বিপত্তি ঘটে। দুভার্গ্যক্রমে এনির দৃষ্টিশক্তি আস্তে আস্তে লোপ পেতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যে এনি অন্ধ হয়ে যান।হেলেনের উপর চাপ বাড়তে থাকে।তিনি ডাক্তার গ্রাহাম বেলের সাহায্য চাইলেন।ডাক্তার বেল হেলেনকে নিজের কন্যার মত স্নেহ করতেন।তিনি হেলেনও এনিকে নিয়ে ইউরোপ গেলেন।এতে করে বিশ্বকে জানার আরেক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
হেলেনের প্রতিভার জন্য তিনি যখন যে দেশে গিয়েছেন সে দেশের মানুষই তাকে অকুণ্ঠ ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় সিক্ত করেছে।
এভাবে দেশে-বিদেশ তাঁর ভক্ত অনুরাগীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সকলেই মুগ্ধ হতেন এই অসামান্য নারীর প্রতিভা দেখে।হেলেন এরইমধ্যে একটি চলচ্চিত্রে নাম ভুমিকায় অভিনয়ের সুযোগ পান।ছবিটির নাম “Deliverance”।তাঁর জীবনীর ওপরই নির্মিত হয় এই চলচ্চিত্রটি।হেলেন বাক শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও সঙ্গীত উপভোগ করার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর।স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে বেশি সঙ্গীত উপভোগ করতেন তিনি।বাদ্যযন্ত্রের ওপর হাত রেখেই বলতে পারতেন কী ধরনের সুর বাজছে।গায়ক-গায়িকার কন্ঠে হাত দিয়ে অনায়াসে বলতে পারতেন কী সঙ্গীত গাইছে।তাঁর এমনই আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল যে কারো সাথে করমর্দন করলে বলে দিতে পারতেন তার পরিচয়!দৃষ্টিহীন হয়েও তিনি নৌকা চালাতে পারতেন,নদীতে সাঁতার কাটতে পারতেন,খেলতে পারতেন দাবাও।এমনকি সেলাইও ছিল তাঁর নখদর্পনে।

১৯৩৫সালে হেলেনের শিক্ষয়িত্রী ও সহযোগী এনি সুলিভ্যান মৃত্যুবরন করেন।এনির এই মৃত্যুকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না হেলেন।এরই মধ্যে শুরু হয় বিশ্বযুদ্ধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের অনুরোধে হেলেন কেলার বিভিন্ন হাসপাতালে যুদ্ধাহত রোগীদের সেবা দিতে শুরু করেন।শান্তি ও আশার বানী শুনাতে থাকেন।যুদ্ধ শেষ হলে বাক- শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশ্বব্যাপী এক আন্দোলন গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন।
রবীন্দ্রনাথের সাথে হেলেনের খুবই সুসম্পর্ক ছিল।রবীন্দ্রনাথ হেলেনকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন।রবীন্দ্রনাথ জীবিত থাকাবস্থায় হেলেন শান্তিনিকেতন আসতে পারেন নি।১৯৫৫সালে ভারতে আসেন হেলেন।সেই সময়েই দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় হেলেনকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করে।১৯৫০সালে হেলেনের পঞ্চাশ বছরের কর্মময় জীবনকে সম্মান জানাতে প্যারিসে এক বিরাট সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়।তখন তাঁর বয়স ৭০বছর।১৯৫৯সালে হেলেন জাতিসংঘ কর্তৃক বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন।তিনি মোট ১১টি বই রচনা করেন।তাঁর উল্লেখযোগ্য বই হলো-The story of my life(1903),The world I live in (1904),Let us have faith (1904),Teacher Annie Sullivan(1955),The open door(1957).
১৯৬৮সালের ১লা জুলাই এই মহিয়সী নারী মৃত্যুবরন করেন।যুগে যুগে এই কীর্তিমান নারীদের রেখে যাওয়া দৃষ্টান্তই হোক সকলের পথ চলার মন্ত্র।
আজ এই মহান ব্যক্তির ১৩৯ তম জন্মদিন। এইদিনে এই কিংবদন্তী নারীর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।

লেখক: বি,এস,এস(অনার্স), এম,এস,এস(অর্থনীতি)।
এমসি কলেজ,সিলেট।

Development by: webnewsdesign.com