ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অংশ হিসেবে বিভিন্ন খাতে ব্যয় করে। প্রতি বছরই বাড়ছে এ ব্যয়। করোনার বছরেও বেড়েছে। তবে অন্যান্য বছরের চেয়ে এ বছরে স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও বলে দেওয়া হয়। ব্যাংকের মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশ ব্যয় করতে বলা হয় স্বাস্থ্য খাতে। তবে এ খাতে মোট সিএসআরের মাত্র ১৮ শতাংশ ব্যয় করেছে ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে দেখা গেছে, গত বছরের জানুয়ারিতে থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৫১৭ কোটি টাকা এবং বছরের শেষ ছয় মাসে ৪৫০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয় করে ব্যাংকগুলো। অর্থাত্ পুরো বছরে ৯৬৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। আগের বছরে এ ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৬৪৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
গত বছর করোনা শুরু হওয়ার পর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাদের সিএসআর ব্যয়ের ৬০ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এক্ষেত্রে চিকিত্সা উপকরণ ও সুরক্ষাসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করার কথা বলা হয়েছিল। তবে বছর শেষে দেখা গেছে তেমনটি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত বছরের পুরো সময়ে ব্যাংকগুলো স্বাস্থ্য খাতে মাত্র ১৮ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেছে। গত বছরে এ খাতে সিএসআর থেকে ১৭৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে ব্যাংকগুলো।
গত বছরের মার্চ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে দেশের জনস্বাস্থ্যে উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। এ লক্ষ্যে সিএসআর কর্মকাণ্ডের আওতায় স্বাস্থ্য খাতে নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি করোনা আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর চিকিত্সায় অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী (পিসিআর, ভেন্টিলেটর মেশিন ও অক্সিজেন সিলিন্ডার) ক্রয় এবং স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত চিকিত্সকসহ সবাইর স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিরসনে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য আপনাদের পরামর্শ প্রদান করা যাচ্ছে। এ সহযোগিতার আওতা জেলা পর্যায়ে বিস্তৃত করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রজ্ঞাপনে আরো বলা হয়, বিদ্যমান নির্দেশনা অনুযায়ী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের জনস্বাস্থ্যে উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় সিএসআর ব্যয় বণ্টন স্বাস্থ্য খাতে ৬০ শতাংশ, শিক্ষা খাতে ৩০ শতাংশ এবং জলবায়ু ঝুঁকি তহবিল খাতে ১০ শতাংশ ব্যয় করার নির্দেশনা রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব বিবেচনায় কোভিড-১৯ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতে নির্ধারিত ৬০ শতাংশ ব্যয়ের পরিমাণ এবং যথার্থতা নিশ্চিত করতে হবে।
টেকসই উন্নয়নের ধারা বজায় রাখার ক্ষেত্রে সিএসআর বর্তমান বিশ্বে ব্যাবসায়িক ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটা এক ধরনের ব্যাবসায়িক শিষ্টাচার বা রীতি, যা সমাজের প্রতি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনকে ব্যবসার নিয়মের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালিত কার্যক্রমের ফলে উদ্ভূত নানারকম পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব দূরীকরণ এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে বিদ্যমান ক্ষোভ, অসমতা ও দারিদ্র্য কমানো সিএসআরের মূল উদ্দেশ্য। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কর পরবর্তী নিট আয় থেকে সিএসআরের অর্থ ব্যয় করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা বিষয়ে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আমাদের দেশ দুর্যোগপ্রবণ হওয়ায় এ খাতে ব্যয় বেশি হয়। আবার সরকারপ্রধান অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ব্যাংকগুলোকে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অর্থের উত্স কম হওয়ায় ব্যাংকগুলোকেই এসব ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হয়। তবে স্বাস্থ্যের বিষয়েও খেয়াল রাখে ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সিএসআর ব্যয়ের মধ্যে ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়। এ খাতে ব্যাংকগুলো ৪০৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। যা মোট সিএসআর ব্যয়ের প্রায় ৪২ শতাংশ। শিক্ষা খাতে ব্যয় করেছে ১০৪ কোটি টাকা। এটি এ খাতে মোট ব্যয়ের ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সংস্কৃতিতে ব্যয় করেছে ৮৯ কোটি টাকা। পরিবেশ খাতে ব্যাংকগুলো ২৪ কোটি টাকা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে ৯ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।
সিএসআর খাতে ২০২০ সালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় করেছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। ব্যাংকটি ২০২০ সালে ৮৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। আগের বছরে যা ছিল ১০৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। এছাড়া গত বছরে সিএসআরে বেশি অর্থ ব্যয় করা ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ৮০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, ডাচ্ বাংলা ব্যাংক ৬৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংক ৫১ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য থেকে জানা গেছে, ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সিএসআর খাতে ২০২০ সালে মাত্র ১৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। যা আগের বছর ছিল মাত্র ৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
Development by: webnewsdesign.com