২০১৪ ও ২০১৮ সালের দুটি একতরফা ও ব্যর্থ জাতীয় নির্বাচনের কারণে বর্তমান সরকার জনগণের কাছে আর দায়বদ্ধ নয়। নির্বাচিত হওয়ার জন্য জনগণের কাছে ‘ভোট ভিক্ষা’ চাওয়ার প্রথা উঠে গেছে। ক্ষমতাসীনদের এখন আর জনগণের ভোটের দরকার হয় না। নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে দরকার প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা। তাই সরকার এদের স্বার্থ দেখতে সদা ব্যস্ত। জনগণের কষ্ট লাঘবে বা কার্যকরভাবে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
‘অর্থনৈতিক সংকট নিরসনের পূর্বশর্ত রাজনৈতিক সংস্কার’ শীর্ষক মঙ্গলবার সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সংগঠনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আইএমএফের কাছ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ নিতে আলোচনার প্রেক্ষাপটে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সুজন। সংগঠনের সহসভাপতি সাবেক বিচারপতি এম এম মতিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সুজন নির্বাহী কমিটির সদস্য ড. আহসান এইচ মনসুর এবং ড. তোফায়েল আহমেদ বক্তব্য দেন।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আইএমএফের সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণে দেশের অর্থনৈতিক সংকট কেটে যাবে না। ঋণ দিতে এসে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সংস্থাটি নানা সংস্কারের শর্ত জুড়ে দিচ্ছে, সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি হলেও তা সংকট সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। কার্যকর গণতন্ত্র এবং সুশাসন ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক সংস্কারই কাজে আসবে না।
লিখিত বক্তব্যে সুজন সম্পাদক বলেন, সুশাসনের অভাব অর্থনৈতিক সংকটের ভয়াবহতার জন্য প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের অভাব থেকে শুরু করে ন্যায়পরায়ণতার অনপুস্থিতি এবং স্বচ্ছতা-জবাবদিহি ও জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণের অভাব। সরকারের আশীর্বাদপুষ্টরা যে যেখানে পারছে গোষ্ঠীতন্ত্র কায়েম করে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। এ অবস্থায় আইএমএফ প্রদত্ত ঋণ ‘ফুটো কলসি সিনড্রম’ বা ছিদ্রযুক্ত কলসিতে পানি ঢালার মতোই হতে পারে। রাজনৈতিক তথা গণতন্ত্রের ঘাটতি পূরণ অর্থাৎ জনগণের ভোটাধিকার ফেরত এবং দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের লাগাম টানা সম্ভব না হলে অর্থনৈতিক সংকট থেকেই যাবে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট সমাধান পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত, একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটি সম্ভব নয়।
দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট সমাধান করতে হলে কার্যকর রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে বলে মত দেন বদিউল আলম মজুদমদার। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংস্কারের প্রথম ও আবশ্যকীয় পদক্ষেপ হবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান। তবে শুধু নির্বাচিত সরকারই গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়। কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ব্যক্তি ও কোটারি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। বহুদলীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না করা, ব্যক্তিতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, দলতন্ত্র ও ফায়দাতন্ত্র পরিহার করা। পরিচ্ছন্ন ও জনমুখী শাসন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বাকস্বাধীনতাসহ নাগরিকদের সব অধিকার সমুন্নত রাখা, পাশাপাশি সব রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির চর্চা করা, যথাযথ আইনি কাঠামো প্রণয়ন ও তা পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সব কাজে সবার অন্তর্ভুক্তিকরণ, সমতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত এবং সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য ২১ দফা রাজনৈতিক সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করেন তিনি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সামনে নির্বাচনের কথা চিন্তা করে হলেও সরকারকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। এ জন্য এখনই সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। বিশেষত বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি কমিয়ে আনা, রিজার্ভ কমে যাওয়া ঠেকানো এবং মূল্যস্টম্ফীতি কমিয়ে আনতে জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নিতে হবে। রাজস্ব নীতিতে পরিবর্তন, বিশেষত সরকারি ব্যয়ে সুশাসন আনতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। আইএমএফের দেওয়া শর্ত কিছুটা হলেও সংস্কার শুরু করতে সাহায্য করবে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, যে কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে নিশ্চিত করে বলা যায়, রাজনৈতিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। এটি ছাড়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের জনসমর্থন প্রায় সমান। তাই সমঝোতা না হলে সবার অনেক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার শঙ্কা আছে।
সমাপনী বক্তব্যে বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক সমঝোতার বিকল্প নেই। তবে রাজপথের সংঘাত কিংবা মারামারিতে এর সমাধান হবে না। দেশে ঋণখেলাপি বাড়ছেই, কোনো প্রতিকার নেই। বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে; কিন্তু ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেই। এ দায়িত্ব কার- বাংলাদেশের মানুষের তা জানার অধিকার আছে। মূল্যস্টম্ফীতির প্রকোপে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। এসব সংকট দূর করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় সমঝোতা এখন সময়ের দাবি।
Development by: webnewsdesign.com