তুরস্ক ও সিরিয়া এখন মৃত্যুপুরী। বেরিয়ে আসছে লাশের পর লাশ। অনেক পরিবারের সবাই মারা হয়েছেন। ফলে এসব নিহতের জন্য কাঁদার মানুষ পর্যন্ত নেই। ভয়াবহ ভূমিকম্প দুই দেশে মৃতের সংখ্যা পাঁচ হাজারের কোটা ছুঁইছুঁই করছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তুরস্কে নিহত তিন হাজার ছাড়িয়েছে। আর সিরিয়ায় এই সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি। প্রাণহানির সংখ্যা দশ হাজার ছাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে হাজার হাজার বিধ্বস্ত ভবনের নিচ থেকে এখনও আসছে বাঁচার আকুতি। এসব ভবন এতটায় ধ্বংস হয়েছে যে তাদেরকে উদ্ধারে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। বাঁচার আকুতি শুনতে পেলেও অনেকের কাছে পৌঁছতে পারছেন না উদ্ধারকারী দল। তাদের চিৎকার ও স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস। ফলে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যা। তবে এ সংখ্যা কোথায় গিয়ে থামে তা অজানা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ধারণা করছে, ভূমিকম্পে মৃত্যুর সংখ্যা পৌঁছতে পারে ২০ হাজারে।
তুরস্কের স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার ভোররাত ৪টা ১৭ মিনিটে সিরিয়ার সীমান্তবর্তী তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৮। ভূমিকম্পটি যখন আঘাত হানে, তখন বেশির ভাগ মানুষ ঘুমাচ্ছিলেন। এরপর দুপুরে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে।
এদিকে ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত তুরস্কের বেশির ভাগ মানুষ এখন রাস্তায়। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে বসে আছেন তারা। ঘরের যেটুকু অবশিষ্ট আছে, সেখানেও ফিরতে ভয় পাচ্ছেন; যদি আবার ভূমিকম্প হয়!
ঘটনাস্থলে থাকা বিবিসির একজন প্রতিবেদকের সাথে স্থানীয় সময় সোমবার সন্ধ্যায় কথা হয়েছে এক পরিবারের। রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে বসে ছিল পরিবারটি। সদস্যরা ঘরের ভেতরে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা বললেন, তাদের মনে হচ্ছে, প্রতিমুহূর্তে ভূমিকম্প হচ্ছে। তারা তাই রাস্তার কাছে চলে এসেছেন।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ভূকম্পনবিদ স্টিফেন হিকস বলেন, এর আগে ১৯৩৯ সালের ডিসেম্বরে তুরস্কের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। ওই সময় ৩০ হাজার মানুষের প্রাণহাণি ঘটে। এরপর ১৯৯৯ সালে তুরস্কের উত্তর–পূর্বাঞ্চলে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার এক ভূমিকম্পে ১৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
ভূমিকম্পবিদরা বলেছেন, ভয়াবহ এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল অস্থিতিশীল ভূপ্রাকৃতিক এক অঞ্চলের আশপাশে। আর সেই অঞ্চলটিকে বলা হয়, পূর্ব আনাতোলিয়ান ফল্ট।
বিবিসি বলছে, বিপজ্জনক এই ফল্ট তুরস্কের দক্ষিণ–পূর্ব সীমান্তের দক্ষিণ পশ্চিম থেকে উত্তর-পশ্চিম বরাবর অবস্থিত। আনাতোলিয়ান এবং আরব প্লেটের মধ্যে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি ফাটল রয়েছে। ভূমিকম্পবিদরা তুরস্কের ওই পূর্ব আনাতোলিয়ান ফল্টকে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে আগেই শনাক্ত করেছিলেন।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানার পর এর যে ‘আফটারশক’ বা পরাঘাত তার মাত্রাও ছিলো ৭ দশমিক ৫। একে আরেকটি ভূমিকম্পই বলছেন তুরস্কের কর্মকর্তারা।
এ নিয়ে সিএনএনের আবহাওয়াবিদ ও দুর্যোগকালীন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ চ্যাড মেয়ারস ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন, কেন এই ভূমিকম্পের পরাঘাতও আরেকটি ভূমিকম্পের মতো শক্তিশালী হয়েছে।
তিনি মনে করেন, ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ‘আফটার শক’টি নিজেই আরেকটি ভূমিকম্প। ওই অঞ্চলে ১৯৯৯ সালের পর এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার ঘটনা। আমরা সাধারণ উপকেন্দ্রের (পৃথিবীর কেন্দ্রে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের বিবেচনায় ভূপৃষ্ঠের যে স্থান) কথা বলে থাকি, কিন্তু এই ভূমিকম্পের বেলায় আমাদের একে ‘উপ-রেখ’ বলা উচিৎ।
মূলত পৃথিবীর ভূ-ভাগের বাইরের পৃষ্ঠটি অনেক টুকরো দিয়ে গঠিত, যেগুলোকে টেকটোনিক প্লেট বলা হয়। পৃথিবী সৃষ্টির আদিতে এই প্লেটগুলো একসাথে ছিল, এগুলো ক্রমেই সরতে সরতে এখন বিভিন্ন মহাদেশের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছে।
সঞ্চালনশীল এই প্লেটগুলোর সীমানা ‘সিস্টেম অব ফল্টস’ হিসেবে পরিচিত। ফল্ট হচ্ছে দুই প্রস্থ পাথরের মধ্যখানের ফাটল বা চ্যুতি। টেকটোনিক প্লেটের এই ফল্টগুলোর হঠাৎ যে কোনো নড়াচড়াই ভূমিকম্পের কারণ।
এ প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক ও ভূকম্পন বিশেষজ্ঞ ক্রিস এলডারস নিউজউইককে বলেন, ‘তুরস্ক ও ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চল খুবই নাজুক একটি অবস্থানে রয়েছে। কারণ অ্যারাবিয়ান টেকটোনিক প্লেটটি উত্তর দিকে সরছে এবং এটার সঙ্গে উত্তরে অবস্থিত ইউরেশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষ হচ্ছে। আর এই দুই প্লেটের অভিঘাতের মাঝখানে তুরস্ক আটকা পড়ে গেছে। দুই প্লেট পাশাপাশি পরস্পরকে ধাক্কা দেওয়ায় তুরস্ক মাঝখানে পড়ে চিপসে যাওয়ার মতো এক পরিস্থিতিতে পড়েছে। আর এটাই এই ভূমিকম্পের কারণ।’
Development by: webnewsdesign.com