মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার একটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জমির খাজনা পরিশোধকে কেন্দ্র করে এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী মো. আব্দুল কাইয়ুম লিখিত অভিযোগে দাবি করেছেন, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) এস. এস. মোকলেছুর রহমান তার কাছে জমির খাজনা পরিশোধের জন্য প্রথমে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার চিৎলীয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুল কাইয়ুম তার প্রয়াত পিতা আব্দুল গফুরের রেখে যাওয়া তিলকপুর মৌজার জমির বকেয়া খাজনা পরিশোধের উদ্দেশ্যে গত ২২ এপ্রিল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কোনো ধরনের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই না করেই তার কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। এত অর্থের কারণ জানতে চাইলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং “টাকা ছাড়া এ অফিসে কোনো কাজ হয় না” বলে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে ২৬ এপ্রিল একজন মুহুরির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অফিসে পাঠানো হলেও একই ধরনের আচরণ করা হয় এবং এবার ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ভুক্তভোগীর মা বার্ধক্যজনিত অসুস্থ থাকায় জমি-জমা ভাগ-বাটোয়ারার কাজ জরুরি হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ভুক্তভোগী নিজেই পুনরায় তহশিলদারের অফিসে গেলে দীর্ঘ অনুরোধের পর অভিযুক্ত কর্মকর্তা ৩৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরবর্তীতে ঝামেলা এড়াতে ভুক্তভোগী ভূমি অফিসের বাইরে একটি চায়ের দোকানে অভিযুক্ত কর্মকর্তার হাতে ৩৫ হাজার টাকা তুলে দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা নেওয়ার পর তাকে অফিসে প্রবেশ না করতে বলে দোকানে অপেক্ষা করতে বলা হয়।
কিছুক্ষণ পর অভিযুক্ত কর্মকর্তা বাইরে একটি দোকানের পেছনে গিয়ে ভুক্তভোগীর সঙ্গে দেখা করেন এবং গোপনে একটি কাগজ হাতে দিয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে যেতে ও দূরে গিয়ে কাগজটি দেখতে বলেন। পরে ভুক্তভোগী একটি অটোরিকশায় করে এলাকা ত্যাগ করেন এবং কিছু দূরে গিয়ে কাগজটি খুলে দেখেন, সেখানে সরকারি রসিদে খাজনা বাবদ উল্লেখ রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৮১১ টাকা।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরে তিনি মোবাইল ফোনে অভিযুক্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চান, ৩৫ হাজার টাকা দেওয়ার পরও কেন রসিদে মাত্র ৩ হাজার ৮১১ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় অভিযুক্ত কর্মকর্তা তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী।
এরপর ভুক্তভোগী মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫ মে ২০২৬ তারিখে জেলা প্রশাসনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (রাজস্ব শাখা, আর.এম. শাখা ও টি-সেল) মো. রইছ আল রেজুয়ানের কার্যালয় থেকে ভুক্তভোগীকে স্বাক্ষীসহ শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়।
নির্ধারিত দিন সকাল সাড়ে ১০টায় ভুক্তভোগী স্বাক্ষীদের নিয়ে উপস্থিত হলে সিনিয়র সহকারী কমিশনার পৃথকভাবে ভুক্তভোগী ও স্বাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করেন এবং সেগুলো মোবাইল ফোনে অডিও রেকর্ড করেন বলে অভিযোগকারী দাবি করেন। শুনানি শেষে রসিদে উল্লেখিত অর্থ বাদে বাকি টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তাকে আশ্বাস দেওয়া হয়।
অভিযোগকারী আরও জানান, একই দিন বিকেলে সিনিয়র সহকারী কমিশনার কমলগঞ্জ ভূমি অফিসে গিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর উপস্থিতিতে ঘটনাটি তদন্ত করেন। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্তের অগ্রগতি বা গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে ভুক্তভোগীকে আর কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
ভুক্তভোগীর দাবি, তিনি একাধিকবার সিনিয়র সহকারী কমিশনারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও প্রতিবারই ‘মিটিংয়ে আছি’ বা ‘ব্যস্ত আছি’—এ ধরনের কারণ দেখিয়ে বিষয়টি পরে জানানো হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা পূর্বে কমলগঞ্জে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং পরে বদলি হয়ে মৌলভীবাজারে যোগদান করেন।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, অভিযুক্ত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে বিতর্কিত। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্ধারিত অর্থের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এই প্রতিবেদকের পক্ষে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারি রসিদে উল্লেখিত অর্থ বাদে অতিরিক্ত আদায় করা অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
Development by: webnewsdesign.com