ব্রেকিং

x

সরকারের ৬ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬০০০ কোটি টাকা

বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ |

সরকারের ৬ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬০০০ কোটি টাকা

রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমাতে নানা উদ্যোগ ও নীতি-সুবিধা দেওয়া হলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। পুরোনো ঋণ নতুন করে খেলাপি হওয়ার পাশাপাশি বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় না হওয়ায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে যা ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতিও বড় আকারে রয়েছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, আগের সরকারের সময়ে বড় ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোকে দেওয়া বিপুল ঋণের একটি অংশ এখন খেলাপি হচ্ছে। আবার পুরোনো খেলাপি ঋণ আদায়েও গতি নেই। ফলে কিছু ঋণ নীতি-সুবিধায় সাময়িকভাবে নিয়মিত হলেও নতুন করে খেলাপি হওয়া ঋণের কারণে সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।

অগ্রণীতে বেড়েছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি
পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে অগ্রণী ব্যাংকে। গত ডিসেম্বরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ২৮ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে বেড়েছে ৩ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। এ সময়ে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা।

অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেকই শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতার কাছে আটকে আছে। এসব বড় গ্রাহকের কাছ থেকে ঋণ আদায় না হওয়াই খেলাপি ঋণ কমানোর পথে বড় বাধা।

জনতার খেলাপি ৭৫ হাজার কোটি ছাড়িয়েছে
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকে। গত ডিসেম্বরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৭২ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৭৫ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। ছয় মাসে বেড়েছে ৩ হাজার ২০ কোটি টাকা। একই সময়ে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ২২৬ কোটি টাকা।

ব্যাংকটির কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক বড় ঋণগ্রহীতা দেশ ছেড়েছেন বা বিভিন্ন মামলায় জড়িয়েছেন। এতে ঋণ আদায় কার্যক্রম ধীর হয়েছে। জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশই শীর্ষ ২০ গ্রুপের কাছে আটকে রয়েছে। এর মধ্যে বেক্সিমকো ও এস আলম গ্রুপের ঋণ উল্লেখযোগ্য।

রূপালীতে বেড়েছে, বেসিকে কমেছে
রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ গত ডিসেম্বরে ছিল ১৯ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ১৯ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে বেড়েছে ১৫৯ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ছিল ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা।

অন্যদিকে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সামান্য কমেছে। গত ডিসেম্বরে ৮ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা থেকে জুনে তা নেমে এসেছে ৮ হাজার ১৫২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ কমেছে ১০২ কোটি টাকা। তবে ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশই এখন খেলাপি।

সোনালীতে খেলাপি কমলেও ঋণ বিতরণে ধীরগতি
সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণও কিছুটা কমেছে। গত ডিসেম্বরে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা থেকে জুন শেষে তা কমে হয়েছে ১৫ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। তবে মোট ঋণের তুলনায় খেলাপির হার এখনো প্রায় ১৫ শতাংশ।

 
ব্যাংকটির কর্মকর্তারা জানান, আগের সরকারের সময়ে বিতরণ করা ঋণের একটি অংশ এখন খেলাপি হচ্ছে। এর মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে।

নতুন ঋণ বিতরণেও সোনালী ব্যাংক বেশ সতর্ক। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ বাড়ার পরিবর্তে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা কমেছে। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমানো, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও ঋণ আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতে পারে এমন অনিশ্চয়তার কারণে কয়েকটি ব্যাংকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও ধীরগতি তৈরি হয়েছে।ব্যাংকারদের মতে, বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা এবং ঋণ আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে শুধু নীতি-সুবিধা দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমানো কঠিন হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আবদুল বায়েস বলেন, দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা না থাকায় বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নীতিগত সুদের হার উচ্চ থাকা এবং সামগ্রিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তা ও ব্যাংক উভয় পক্ষই নতুন বিনিয়োগ ও ঋণ কার্যক্রমে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

তিনি বলেন, ব্যাংকখাতে বিপুল খেলাপি ঋণ এবং বকেয়া অর্থ আদায়ে ধীরগতির কারণে তারল্য পরিস্থিতিরও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না। তবে এ পরিস্থিতিতে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে হলে কার্যকর অর্থনৈতিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।

×
News Image
বিস্তারিত কমেন্টে…

Development by: webnewsdesign.com