দেশে গৃহঋণের একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন বা বিএইচবিএফসি। গৃহঋণ দেওয়াটাই এই প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ। সরকারি ব্যাংকগুলোও গৃহঋণ দেয়, দেয় অনেক বেসরকারি ব্যাংকও। এর বাইরে আবাসন খাতে ঋণ দেওয়ার জন্যই গড়ে উঠেছে বেসরকারি কিছু কোম্পানি। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং বা ডিবিএইচ, ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ইত্যাদি। ভালো অঙ্কের ঋণ দিতে গড়ে উঠেছে লংকাবাংলা ফিন্যান্স, আইডিএলসি, আইপিডিসির মতো কিছু লিজিং কোম্পানি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানও।
ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে
ব্যাংক অথবা হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণ বা ফ্ল্যাট কিনতে চাইলে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ টাকা নিজের থাকতে হয়। অর্থাৎ ১ কোটি টাকার ফ্ল্যাট কিনতে প্রতিষ্ঠানগুলো ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়। বাকি ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা ক্রেতার নিজের থাকতে হয়। যদিও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এ নিয়ম প্রযোজ্য নয়। তারা ফ্ল্যাটের দামের পুরো টাকাই ঋণ দিতে পারে। বিএইচবিএফসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেবাশীষ চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় গৃহঋণের জোগান কম। এ খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। বার্ষিক চাহিদার মাত্র ৭ শতাংশ সরকার পূরণ করছে। বাকিটার জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে বেসরকারি খাতের ওপর।’
লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের হেড অব রিটেইল খোরশেদ আলম বলেন, ‘সেবার মানের কারণে। দ্রুততম সময়ে এবং নিশ্চিত ঋণ প্রদানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের চেয়ে এগিয়ে। হোম লোনের জন্য ব্যাংকে গিয়ে অনেকেই ঋণ পান না। পেলেও সময় লাগে। গ্রাহকদের মান যাচাই করে দ্রুত ঋণ অনুমোদন ও ছাড় করা হয়। এ কারণে অনেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে পছন্দ করেন।’
কোন ঋণ, কত টাকা
বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন প্রধানত ঋণ দেয় বাড়ি নির্মাণে। ফ্ল্যাট কেনার জন্যও ঋণ দেয়, তবে তা খুবই সামান্য। এমনকি ফ্ল্যাট নিবন্ধন করতেও ঋণ দেয় এই প্রতিষ্ঠান। আর ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রায় একই ধরনের ঋণ দেয়। বিএইচবিএফসি এখন পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অভিজাত এলাকায় বাড়ি নির্মাণে এক ব্যক্তিকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়। অর্থ মন্ত্রণালয় এ ঋণের পরিমাণ ২ কোটি টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধির অনুমোদন দিয়েছে। সংস্থাটি কৃষকদের বাড়ি করার জন্যও ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিচ্ছে। আর প্রবাসীদের দিচ্ছে ১ কোটি টাকা। এ ছাড়া আবাসন মেরামতের জন্য এই সংস্থার ঋণের পরিমাণ ২৫ লাখ টাকা। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ দিচ্ছে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক বাড়ি নির্মাণে ‘সোনালী নীড়’ নামে গ্রামাঞ্চলে ঋণ দিচ্ছে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। আইএফআইসি ব্যাংক আবাসন ঋণে গুরুত্ব দিয়ে ‘আমার বাড়ি’ নামে আলাদা একটি সেবা চালু করেছে। বাড়ি নির্মাণে ২ কোটি টাকা দিলেও ব্যাংকটি সেমিপাকা ভবন নির্মাণে দিচ্ছে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ। ডিবিএইচ বাড়ি নির্মাণ, বাড়ি বর্ধিতকরণ, বাড়ি উন্নয়ন, ফ্ল্যাট কেনা ও প্লট কেনায় ঋণ দিচ্ছে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী ২ কোটি টাকা পর্যন্ত। ন্যাশনাল হাউজিং ঋণ দিচ্ছে ফ্ল্যাট কেনা, নিজের বাড়ি নির্মাণ, বাড়ি বর্ধিতকরণ, প্লট কেনা, বাণিজ্যিক ভবনে জায়গা কেনা ইত্যাদি খাতে।
সুদের পরিমাণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্ল্যাট কেনা ও বাড়ি নির্মাণে বেসরকারি খাতের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গৃহঋণ দিচ্ছে ৯ থেকে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ সুদে। তবে গৃহঋণে একমাত্র বিএইচবিএফসিই সরল সুদে ঋণ দিচ্ছে। অন্যদের সুদ চক্রবৃদ্ধি হারে। বিএইচবিএফসির সুদও কম। কৃষকদের জন্য ৭ শতাংশ। আর ফ্ল্যাট ও বাড়ি নির্মাণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ। সোনালী ব্যাংকও ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে গ্রামাঞ্চলে বাড়ি নির্মাণে। তবে অন্য ঋণ পণ্যে সুদের হার ৯ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকের ঋণের সুদ বেশি। এদের সুদের হার ব্যাংকভেদে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত। তবে কোনো কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহক বুঝে সুদের হার ৯ শতাংশও রাখছে।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
গৃহঋণ পেতে কী কাগজপত্র লাগে- এই প্রশ্ন অনেকের। এর সমাধান খুঁজি চলুন- সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন থেকে ঋণ নিতে কাগজপত্র একটু বেশি লাগে। একই কাগজপত্র লাগে সরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রেও। তবে বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এত কাগজপত্র চায় না। বাড়ি নির্মাণের চেয়ে অবশ্য ফ্ল্যাট কেনায় কাগজপত্র কম লাগে। বাড়ি নির্মাণ ঋণের জন্য যা যা দরকার-
– যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত নকশার সত্যায়িত ফটোকপি।
– মূল দলিল
– নামজারি খতিয়ান।
– খাজনা রসিদের সত্যায়িত ফটোকপি।
– সিএস, এসএ এবং আরএস।
– বিএস খতিয়ানের সত্যায়িত কপি।
– জেলা বা সাব রেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে ১২ বছরের তল্লাশিসহ নির্দায় সনদ বা এনইসি।
– সরকার থেকে বরাদ্দ পাওয়া জমির ক্ষেত্রে মূল বরাদ্দপত্র।
– দখল হস্তান্তরপত্র।
– আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত কপি।
-তিন কপি সত্যায়িত স্বাক্ষর।
– সদ্য তোলা দুই কপি পাসপোর্ট আকারের সত্যায়িত ছবি।
– তিন হাজার টাকা আবেদন ফি জমার রসিদ।
– আবেদনকারীর আয়ের প্রমাণপত্র।
– চাকরির ক্ষেত্রে ঋণ আবেদন ফরমের নির্দিষ্ট পাতায় বেতন সনদ এবং ব্যবসার ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স ও আয় সম্পর্কে হলফনামা।
– আয়কর পরিশোধযোগ্য আয় হলে ই-টিআইএন নম্বরসহ আয়ের পরিমাণ উল্লেখসহ আয়কর প্রত্যয়নপত্র।
– ঋণ আবেদনকারীর নিজস্ব আয় না থাকলে উপার্জনশীল পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানকে জামিনদার করা যায়।
– অনুমোদিত নকশা মোতাবেক বাড়ি নির্মাণ করা হবে এবং অন্য কোথাও থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণ করা হবে না মর্মে উপযুক্ত মূল্যমানের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ঘোষণাপত্র।
– প্রকৌশল সনদ ও ভূমিকম্প প্রতিরোধী সনদ।
আপনি যদি ফ্ল্যাট ঋণের জন্য আবেদন করতে যান সে ক্ষেত্রে এই লম্বা তালিকার প্রয়োজন হবে না।
Development by: webnewsdesign.com