রাজধানীর ঘিঞ্জি এলাকা থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ২০১৫ সালের জাতীয় নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয় বিসিক প্লাস্টিক শিল্পনগরী প্রকল্পের। মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদীখান উপজেলার কেয়াইন ইউনিয়নের বড়বর্ত্তা মৌজায় ৫০ একর জমিতে এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্লাস্টিক কারখানার আলাদা জোন হওয়ার কথা। তবে অনুমোদনের সাত বছর পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত জমি অধিগ্রহণই হয়নি।
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৭১ জন প্রাণ হারান। ওই ঘটনার পর সরকার দ্রুত সেখান থেকে কারখানা স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় এবং প্রকল্প হাতে নেয়। গত বছরের জুনে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসককে গত বছরের জুনে ২১৮ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ করতে পারেনি জেলা প্রশাসন। প্রকল্পের ৫০ একর জমির মধ্যে ৩৩ একর সরকারি খাসজমি। বাকি ১৭ একর স্থানীয় বাসিন্দাদের। ফলে কয়েকবার জেলা প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিয়ে গেলেও জমি অধিগ্রহণ করতে পারেনি। স্থানীয় লোকজন জমি অধিগ্রহণে বাধা দিচ্ছে। জানা গেছে, এ খাসজমিতে বর্তমান ও সাবেক আমলাদের একটি অংশ ‘ডিসি নিবাস’ (জেলা প্রশাসক) নামে আবাসন প্রকল্প করতে চান। বিষয়টি শিল্প মন্ত্রণালয়ও জানে। যদি ‘ডিসি নিবাস’ স্থাপনের কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত হয়নি। প্লাস্টিক খাতের উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, তাঁরাও শুনছেন, সেখানে ডিসিদের জন্য আবাসিক এলাকা নির্মাণে একটি পক্ষ তৎপরতা চালাচ্ছে।
প্লাস্টিক শিল্পের জন্য আলাদা একটি শিল্পনগরী স্থাপনের জন্য ২০০৬ সাল থেকে দাবি জানিয়ে আসছিলেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও সেখানে ১৫ থেকে ২০ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। তবে সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও সাবেক ও বর্তমান কিছু সরকারি কর্মকর্তার কৌশলের কারণে প্রকল্পটির কাজ শুরু হচ্ছে না। শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিকের সঙ্গে বারবার সভা করলেও কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। এখনও পুরান ঢাকার লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর ও ইসলামবাগ এলাকায় প্রায় তিন হাজার প্লাস্টিক ও প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনের কারখানা রয়েছে। এখানে যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। প্রকল্পটি বাদ হলে কিংবা নতুন করে স্থান নির্বাচন করতে গেলে তা বাস্তবায়নে আরও পিছিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সমিতির (বিপিজিএমইএ) সভাপতি শামীম আহমেদ বলেন, রাজধানীকে যানজট ও দুর্ঘটনামুক্ত শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে সরকার একটি ভালো উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু একটি পক্ষের কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তিনি বলেন, ১৭ কোটি ডলারের বেশি রপ্তানি আয় এ খাত থেকে। গত বছরের তুলনায় এ বছর রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৩ শতাংশ। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০ শতাংশ। ৬ থেকে ৭ লাখ লোক জড়িত রয়েছে এ খাতে। কিন্তু প্লাস্টিক শিল্পনগরী প্রকল্প শেষ না হওয়ায় কারখানা মালিকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। দীর্ঘমেয়াদে নতুন বিনিয়োগ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদনও বাড়ানো যাচ্ছে না।
প্রকল্প-সংশ্নিষ্টরা জানান, জমি অধিগ্রহণে ভূমি মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছে। কিছু জটিলতা থাকার কারণে প্রকল্পটির জমি অধিগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তাই কাজ শুরু করা হয়নি। জমি বুঝে পেলে প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। বিসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক নিজাম উদ্দিন বলেন, জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ হিসাবে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। তবু স্থানীয় কিছু লোক জোর করে জায়গা দখল করে আছে। তবে প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
২০১৫ সালের ১ ডিসেম্বর প্লাস্টিক শিল্পনগরী একনেকে অনুমোদন করা হয়। এর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ২০১৮ সালের জুনে। দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এখানে ৩৬০টি প্লটে ২৫০টি এসএমই শিল্প ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়। এতে প্রায় ১৮ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ১৩৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও কয়েক দফায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২৮ কোটি টাকায়।
Development by: webnewsdesign.com