কখনও বাড়ছে মাঝারি, কখনও চিকন, আবার কখনও মোটা- এভাবে কৌশলে চড়ছে প্রধান খাদ্যশস্য চালের দাম। গেল এক সপ্তাহে সব ধরনের চাল কেজিতে দুই-এক টাকা করে বেড়েছে। একই সঙ্গে আটা-ময়দার দামও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। পণ্যটির দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ টাকা। দাম বাড়ার তালিকায় আবার উঠে এসেছে মসুর ডাল ও ছোলা। একের পর এক পণ্যের দাম বাড়ার কারণে ক্রেতার ওপর চাপ আরও বাড়ছে। আগুন দরের কারণে কেউ কেউ পণ্য কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর গ্রিনরোড এলাকা থেকে চাল কিনতে কারওয়ান বাজারে আসেন আব্দুল বারেক। তিনি বলেন, ‘সংসারে প্রতিদিন চাল, আটা-ময়দা, ডাল, তেল ও চিনির দরকার হয়। এ ক’টি জিনিসের দামই বেশি। ১০-১২ দিন পর বাজারে এলে দেখি আগের চেয়ে কেজিতে ৪ থেকে ৫ টাকা বেড়ে গেছে। পত্রিকায় এসব লিখেও লাভ নেই। এখন খাওয়া কমানোর চেষ্টা করছি।’
মালিবাগ বাজারে ক্রেতা নাজনীন বেগম বলেন, ‘আটার দাম এখন চালের চেয়েও বেশি। তেল-চিনি পাওয়া যাচ্ছে না। দুই-এক দোকানে পাওয়া গেলেও দাম বেশি। আগে ৫ লিটার করে তেল, ৫ কেজি করে আটা কিনতাম। এখন দুই কেজির বেশি কিনি না। আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের ঢাকায় থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
মালিবাগ, তেজকুনিপাড়া ও কারওয়ান বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুচরা পর্যায়েও মোটা চাল কেজিতে এক থেকে দুই টাকা বেড়েছে। মোটা চালের মধ্যে পাইজামের কেজি ৫৪ থেকে ৫৫ টাকা এবং গুটিস্বর্ণা জাতের চাল ৫০ থেকে ৫৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি চালের মধ্যে বিআর-২৮ জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬২ টাকায়, মিনিকেট মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৭২ থেকে ৭৫ টাকায়। আর নাজিরশাইলের কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকা।
তেজকুনিপাড়ার সুমা জেনারেল স্টোরের বিক্রয়কর্মী মো. শুভ বলেন, পাইকারিবাজারে চালের দাম বস্তায় ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। চার-পাঁচ দিন ধরে আটা দিচ্ছে না কোনো কোম্পানি।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, আমদানি কম হচ্ছে। এ কারণে মিলাররা চালের দাম বাড়াচ্ছে। গত এক সপ্তাহে মিলগেটে চালের বস্তায় (৫০ কেজি) ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। চাহিদা মতো চাল দিচ্ছে না বলেও অভিযোগ তাদের। কারওয়ান বাজারের পাইকারি চাল বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ইসমাইল অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী জসিম উদ্দিন বলেন, কৌশলে চালের দাম বাড়াচ্ছেন মিলাররা। কয়েকদিন আগে মোটা চালের দাম বেড়েছিল। এখন মিনিকেটের দাম বেড়েছে। চাহিদা মতো চাল দিতেও কার্পণ্য করছেন মিলাররা।
এদিকে সরকার অনুমতি দিলেও আমদানিকারকরা চাল আমদানিতে উৎসাহ দেখাচ্ছেন না। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া ও এলসি খুলতে না পারার কারণে অনেক ব্যবসায়ী চাল আমদানি করছেন না।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এ বছরের জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত বেসরকারিভাবে চাল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টনের। এর মধ্যে এলসি খোলা হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৯২ হাজার টনের। আমদানি করা হয়েছে মাত্র ২ লাখ ১২ হাজার টন। তবে সরকারিসহ মোট আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ৭ হাজার টন। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে মোট গম আমদানি হয়েছে ৫ লাখ ৮৩ হাজার টন।
এক-দেড় মাস আগে এক দফা বেড়েছিল আটা-ময়দার দাম। এখন আবারও বেড়েছে। গত এক সপ্তাহে খুচরা পর্যায়ে খোলা আটা কেজিতে বেড়েছে ৫ টাকা পর্যন্ত। খোলা ও প্যাকেটজাত উভয় ধরনের আটা বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা কেজি দরে। আর ময়দা বিক্রি হচ্ছে কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে।
মালিবাগ বাজারের মায়ের দোয়া স্টোরের বিক্রয়কর্মী আল-আমীন বলেন, আটার দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ টাকা করে। খোলা এবং প্যাকেটজাত দুই ধরনের আটাই বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা দরে। এরপরও কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, প্যাকেটজাত আটার দাম আরও বাড়াবে তারা।
ডালের দরও ছুটছে। দেশি মসুর ডাল ১৪০ এবং আমদানি করা মসুর ১০৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহ খানেক দেশি মসুর ১৩৫ এবং আমদানি করা মসুর ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ছোলার দাম এক সপ্তাহে কেজিতে বেড়েছে ১০ টাকা। প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮৮ থেকে ৯০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে ছোলা বিক্রি হয়েছে ৭৮ থেকে ৮০ টাকায়।
প্যাকেটজাত চিনির সংকট এখনও কাটেনি। দু-এক দোকানে খোলা চিনি মিললেও কেজি কিনতে হচ্ছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায়। সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের পর বাজারে সরবরাহ কিছুটা কমেছে। তবে খুচরা পর্যায়ে এখনও দাম বাড়েনি।
ভোগ্যপণ্য আমদানি ও বাজারজাত করে এমন একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মকর্তা বলেন, ডলার সংকটের কারণে কোম্পানিগুলো এলসি খুলতে পারছে না, গ্যাস সংকটে কারখানায় উৎপাদন কমে অর্ধেকে নেমেছে। আমদানি না হলে বাজারে সরবরাহ বাড়বে কীভাবে?
Development by: webnewsdesign.com