বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত সংস্কারে সহযোগিতা ও সমর্থনের ব্যাপারে বিশ্বনেতারা একাট্টা। তবে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে যে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার প্রয়োজন, সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে অন্তর্বর্তী সরকারকেই। মোদ্দা কথা, ‘সংস্কার পরীক্ষায় পাস’ করতে হবে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। তবে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার করতে না পারলে বিশ্বের এ সমর্থন তেমন একটা ফল বয়ে আনবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রে ৭৯তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি ড. ইউনূস মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট, কয়েকটি দেশের সরকারপ্রধানসহ একাধিক বিশ্বনেতার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা সবাই এক বাক্যে বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত সংস্কার চান। এজন্য ড. ইউনূসকে যে কোনো সহায়তা দিতেও তারা প্রস্তুত।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকার বিভিন্ন খাতে কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়টি চিহ্নিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) মোটামুটি সবাই বাংলাদেশ ও ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি সমর্থনের বার্তা দিয়েছে। গেল ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অনেক বড় দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন অধ্যাপক ইউনূস। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা যাতে কেউ নিজের দখলে না নিতে পারে সেজন্য নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন, জনপ্রশাসন এবং সংবিধান সংস্কারের মতো বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে ছয়টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। আর এসব সংস্কারের জন্য বহির্বিশ্বের সমর্থন প্রয়োজন। তবে সবচেয়ে বেশি জরুরি অভ্যন্তরীণভাবে সব পক্ষের ঐকমত্যের ভিত্তিতে কঙ্ক্ষিত সংস্কার করা। বিষয়টি খুব একটা সহজ নয়। কারণ, গত সাড়ে ১৫ বছরে সাংবিধানিকসহ দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করে যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, এর পুনর্গঠন করতে হবে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে।
ড. ইউনূসের জাতিসংঘ সফরকে তাঁর অসাধারণ কূটনীতি হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। দেশ হিসেবে বাংলাদেশ উপকৃত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এটিকে আমরা জাতি হিসেবে কীভাবে কাজে লাগাব সেটি আমাদের ঠিক করতে হবে।
সফর থেকে কী পেলাম এর বিশ্লেষণে সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, আমরা ইতোমধ্যে পাওয়া শুরু করেছি। যেমন– জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন আমাদের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং ব্যাংকিং খাত সংস্কারে সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছি। এরই মধ্যে সংস্কারের সুপারিশের জন্য ছয় কমিশনকে সরকার সময়ও বেঁধে দিয়েছে। এখন নির্ধারণ করতে হবে কমিশন থেকে পাওয়া সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে আমরা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে কী ধরনের কারিগরি সহযোগিতা চাইব।
এম হুমায়ুন কবির আরও বলেন, সুপারিশের ভিত্তিতে যে কারিগরি সহযোগিতা আমরা পাব, তা বাস্তবায়নে দরকার অর্থ। আর সে অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ। এখন এটির বিষয়ে নিজেরা কতটা প্রস্তুত এবং আমরা কী করতে চাই, এর জন্য নীতি প্রয়োজন। এর ভিত্তিতেই আসবে বাস্তবায়ন। এর জন্য দরকার বর্তমান সরকারের দক্ষতা ও প্রতিশ্রুতি।
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে সংস্থাটির সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের এক ফাঁকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। এ সময় অজয় বাঙ্গা জানান, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে। এর মধ্যে নতুন ঋণ থাকবে অন্তত দুই বিলিয়ন ডলার। বাকি দেড় বিলিয়ন ডলার বিদ্যমান কর্মসূচি থেকে পুনর্বিন্যাস করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে অজয় বাঙ্গা বলেন, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে ডিজিটালাইজেশন, তারল্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতের সংস্কারে সহায়তা করবে। বৈঠকে ড. ইউনূস সংস্কার পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা চান। বিশ্বব্যাংকের ঋণ কর্মসূচিতে সৃজনশীলতা আনারও আহ্বান জানান তিনি। ড. ইউনূস বলেন, এটি দেশ পুনর্গঠনের একটি বড় সুযোগ।
মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদরদপ্তরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার সঙ্গে বৈঠকে এ কথা জানান প্রধান উপদেষ্টা। বৈঠকে ড. ইউনূস বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটেছে। বর্তমান বাংলাদেশ একটি নতুন দেশ।
সংস্কারের জন্য গঠিত ছয় কমিশনের সুপারিশ নিয়ে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ এবং ভোটার তালিকা তৈরি হলে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে। এ সময় রাষ্ট্র সংস্কারে আইএমএফ ড. ইউনূস সরকারের ‘পাশে আছে’ বলে জানিয়েছেন আইএমএফের নির্বাহী ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।
ঋণদাতা সংস্থাটি এই সরকারের জন্য আর্থিক সহায়তার বিষয়টি দ্রুত ‘ট্র্যাক করবে’ জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে আইএমএফের একটি দল পাঠানো হয়েছে, দলটি এখন ঢাকায় রয়েছে। আগামী মাসে দলের সদস্যরা আইএমএফ পরিচালনা পর্ষদের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেবেন।
জর্জিয়েভা বলেন, আইএমএফ বোর্ড দলের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন ঋণদান কর্মসূচি শুরু করতে পারে অথবা গত বছরের শুরুর দিকে চালু হওয়া বিদ্যমান সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আরও ঋণ দিতে পারে।
এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং আর্থিক খাত সংস্কারের বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে অর্থ ফেরত আনতে সহায়তা চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুরসহ ১০টি দেশে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এ দুটি বহুজাতিক সংস্থার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করার উদ্যোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে টাস্কফোর্স গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক খাতের শ্বেতপত্র প্রকাশের পদক্ষেপ নেবে এই টাস্কফোর্স। একই সঙ্গে আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এ খাতের প্রধান ঝুঁকি, ঋণের প্রকৃত অবস্থা, তারল্য পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হবে। এ-সংক্রান্ত আরও দুটি টাস্কফোর্সও শিগগিরই গঠন হবে বলে জানা গেছে।
সংকট থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারকে স্বল্পমেয়াদি একটি পরিকল্পনার প্রস্তাব দিতে এবং অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণ-সংক্রান্ত আরও একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থা ও তা থেকে উত্তরণে সুপারিশের জন্য শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এসব সংস্কার কার্যক্রম সময়সাপেক্ষ বিষয়। ইতোমধ্যে বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচন নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে, তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে এসব বাস্তবায়ন বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, আর্থিক খাতে সংস্কার সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট এবং বেশ কয়েকটি ব্যাংক মারাত্মক তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। তবে আশা করা যায়, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, অদূর ভবিষ্যতে এসব সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ অন্যান্য দাতা সংস্থা থেকে বাড়তি ঋণের আশ্বাস পাওয়া গেছে। এগুলো পাওয়া গেলে ডলার সংকট কিছুটা হলেও কেটে যাবে। তিনি আরও বলেন, ছয়টি কমিশনের প্রতিবেদনই নির্ধারণ করে দেবে সরকার কী কী সংস্কার করতে পারবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই চ্যালেঞ্জের ধরন বোঝা যাবে। অর্থ ফেরত আনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা অনেক চ্যালেঞ্জিং। সরকার তা কতটুকু পারবে, এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
Development by: webnewsdesign.com